শুক্ল-যজুর্ব্বেদীয়

ঈশোপনিষৎ

မြန်မာဘာသာ

শ্রীমৎ-পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য- শঙ্করভগবৎকৃত-ভাষ্যসমেত

মূল, অন্বয়মুখী-ব্যাখ্যা-মূলানুবাদ-ভাষ্য-ভাষ্যানুবাদ ও টিপ্পনী সহিত।

***

সম্পাদক ও অনুবাদক

শ্রীযুক্ত পণ্ডিত দুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ।

সহকারী সম্পাদক সত্ত্বাধিকারী ও প্রকাশক শ্রীঅনিলচন্দ্র দত্ত। লোটাস্ লাইব্রেরী, ৫০ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা। ১৩১৮ সাল।

All rights reserved.

প্রিন্টারঃ—শ্রীআশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, মেট্‌কাফ্ প্রেস,

৭৬ নং বলরাম দে ষ্ট্রীট,—কলিকাতা।

আভাস।

একদা আদিপুরুষ ব্রহ্মা যোগাসনে সমাসীন হইয়া, স্থিরচিত্তে পরমাত্ম-চিন্তায় নিমগ্ন আছেন, এমন সময় কল্যাণময় পরমেশ্বরের কৃপায় তাঁহার হৃদয়-কন্দরে একটি অস্ফুট নাদধ্বনি অভিব্যক্ত হইল; পরে সর্ব্ববেদের বীজরূপী, ব্রহ্মনাম প্রণব ও স্বর-ব্যঞ্জনময় বর্ণরাশি একে একে অভিব্যক্ত হইল। তখন ব্রহ্মা সেই বর্ণরাশির সহযোগে যে শব্দসমূহ চতুর্মুখে উচ্চারণ করিলেন জগতে তাহাই ‘বেদবিদ্যা বলিয়া বিখ্যাত হইল।

অনন্তর, তিনি সেই অপূর্ব্ব বেদবিদ্যার বিস্তার-মানসে মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা প্রভৃতি ঋষিগণকে তাহা শিক্ষা দিতে লাগিলেন। ক্রমে বৈদিক জ্ঞানালোক জগতে প্রসারিত হইয়া পড়িল। এইরূপে যুগযুগান্তর চলিতে লাগিল; ক্রমে দ্বাপর যুগ আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন,—

“পরাশরাৎ সত্যবত্যাং অংশাংশ কলয়া বিভুঃ। অবতীর্ণো মহাভাগঃ বেদং চক্রে চতুর্বিধম্। ঋগথর্ব-যজুঃসাম্নাং রাশীন্ উদ্ধৃত্য বর্গশঃ। চতস্রঃ সংহিতাশ্চক্রে মন্ত্রৈর্মণিগণা ইব ॥”

ভগবান্ নারায়ণ পরাশরের ঔরসে সত্যবতীর গর্ভে অবতীর্ণ হন; তাঁহার নাম হইল ‘কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন’। তিনি বেদশিক্ষার সৌকর্য্যার্থ এক এক শ্রেণীর মন্ত্রসমূহ একত্র সংগ্রহ করিয়া ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্ব্ব নামে চারিটি সংহিতা সংকলন করিলেন। এই প্রকার বেদ-বিভাগের ফলে তখন হইতে কৃষ্ণ- দ্বৈপায়নের অপর নাম হইল—‘বেদব্যাস’।

বেদব্যাস কেবল বেদ-বিভাগ করিয়াই নিশ্চিন্ত হইলেন না; যাহাতে সে সকলের সুবহুল’ প্রচার হইতে পারে, তাহার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। প্রথমে নিজের প্রধান শিষ্য পৈল, বৈশম্পায়ন, জৈমিনি ও সুমন্ত, এই চারি জনকে যথাক্রমে ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্ব্ব, এই চারিটি সংহিতা শিক্ষা দিলেন। শিক্ষাপ্রাপ্ত সেই শিষ্যগণ আবার নিজ নিজ শিষ্যমণ্ডলীর মধ্যে যথাযথরূপে চতুর্ব্বেদের শিক্ষা দিতে, লাগিলেন। তন্মধ্যে বৈশম্পায়ন-শিষ্য যাজ্ঞবল্ক্যের কথাই এখানে. বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

%

এক সময় ঋষিমণ্ডলে একটি নিয়ম নিবদ্ধ হয় যে,—

“ঋষির্যোহদ্য মহামেরৌ সমাজে নাগমিষ্যতি।

তস্য বৈ সপ্তরাত্রান্তু ব্রহ্মহত্যা ভবিষ্যতি ॥”

অদ্য এই মেশিখরস্থিত ঋষিসমাজে যে ঋষি সমাগত না হইবেন, সপ্তরাত্রির মধ্যে তাঁহাকে ব্রহ্মহত্যাপাপে লিপ্ত হইতে হইবে। কিন্তু এইরূপ নিয়ম সত্ত্বেও মহর্ষি বৈশম্পায়ন কোন কারণে সেই সমাজে উপস্থিত হইতে পারেন নাই; অথচ ঘটনাক্রমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অতর্কিতভাবে তাঁহার দ্বারা একটি ব্রহ্মহত্যা সংঘটিত হইয়া পড়ে। তখন তিনি স্বীয় পাপবিমোচনার্থ নিজের প্রতিনিধিরূপে শিষ্যগণকে তপস্যা করিবার আদেশ করিলেন। শিষ্যগণও অবনতমস্তকে গুরুর আজ্ঞা শিরোধারণপূর্ব্বক তপস্যায় প্রবৃত্ত হইলেন। এমন সময় অন্যতম শিষ্য যাজ্ঞবল্ক্য আসিয়া বৈশম্পায়নকে বলিতে লাগিলেন,—

“যাজ্ঞবল্ক্যশ্চ তচ্ছিষ্যমাহাহো ভগবন্! কিয়ৎ।

চরিতেনাল্পসারাণাং, করিষ্যেহং সুদুশ্চরম্ ॥”

ভগবন্! আপনার এই সকল শিষ্য অতি অসার—হীনবীর্য্য; ইহাদের সুদীর্ঘ তপস্যায়ও আপনার অভীষ্ট ফল লাভের আশা নাই। আজ্ঞা করুন, আমিই উগ্র তপস্যাদ্বারা আপনার পাপ বিধ্বস্ত করিব। যাজ্ঞবল্ক্যের এবংবিধ পর্বিত বচন শ্রবণ করিয়া—

“ইত্যুক্তো গুরুরপ্যাহ কুপিতো যাহলং দ্বয়া।

বিপ্রাবন্ধা শিষ্যেণ, মদধীতং ত্যজাশ্বিতি ॥”

যাজ্ঞবল্ক্য-গুরু বৈশম্পায়ন কোপসহকারে বলিলেন,-‘তোমার ন্যায় ব্রাহ্মণাবজ্ঞাকারী শিষ্যে আমার প্রয়োজন নাই; তুমি অবিলম্বে চলিয়া যাও, এবং আমার নিকট যে কিছু বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছ, তাহা প্রত্যর্পণ কর।’ অভিমানী যাজ্ঞবল্ক্যও গুরুর আদেশানুসারে অধীত সমস্ত বেদবিদ্যা তৎক্ষণাৎ উদগীরণ করিয়া ফেলিলেন। তত্রত্য কতিপয় ঋষি ঐরূপে বেদের দুর্দশা দর্শনে দুঃখিত হইয়া, উদগীর্ণ রাশি গ্রহণে অভিলাষী হইলেন; কিন্তু মনুষ্যদেহে বান্ত ভক্ষণ অবিহিত বিবেচনা করিয়া, তিত্তিরী পক্ষীর রূপ ধারণ করিলেন; এবং সেই শরীরে উদ্দীর্ণ বেদসমূহ ভক্ষণ করিলেন; অনন্তর তাহারা নিজ নিজ

%

সম্প্রদায় মধ্যে সেই বেদের প্রচার করিতে থাকিলেন। তদবধি সেই বেদভাগ ‘কৃষ্ণযজুর্ব্বেদ’ ও ‘তৈত্তিরীয় শাখা’ নামে প্রসিদ্ধ হইল।

এদিকে যাজ্ঞবল্ক্য সমস্ত বেদবিদ্যা পরিত্যাগ করিয়া, নিতান্ত বিষণ্ণচিত্তে চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, বেদবিজ্ঞানহীন জীবন পশুব ন্যায় হীন ও ঘৃণার পাত্র; এখন কি উপায়ে কাহার নিকট বেদ শিক্ষা করি। এইরূপ চিন্তা করিতেছেন, এমন সময় তাঁহার স্মরণ হইল যে,—

“ঋগ্‌ভিঃ পূর্ব্বাহ্নে দিবি দেব ঈয়তে, যজুর্ব্বেদে তিষ্ঠতি মধ্যে অহ্নঃ। সামবেদেনাস্তময়ে মহীয়তে, বেদৈরশূন্যস্ত্রিভিরেতি দেবঃ ॥”

এই স্বয়ং প্রকাশমান সূর্য্যদেব পূর্ব্বাহ্ণে ঋগ্বেদে ভূষিত হইয়া, গগনে উদিত হন; মধ্যাহ্নে যজুর্ব্বেদে অধিষ্ঠ’ন করেন এবং সায়ংসময়ে সামবেদে শোভিত হন; ইনি ত্রিসন্ধ্যাই বেদশূন্য হইয়া থাকেন না। অতএব, ইহাঁর নিকটই বেদ শিক্ষা করিব। যাজ্ঞবল্ক্য এইরূপ কৃতসংকল্প হইয়া সূর্য্যের আরাধনায় প্রবৃত্ত হইলেন, সূর্য্যদেবও আরাধনায় সন্তুষ্ট হইয়া, বাজীরূপ ধারণ পূর্ব্বক যাজ্ঞবল্ক্যকে বেদবিদ্যা শিক্ষা দিলেন। সূর্য্যোপদিষ্ট এই বেদভাগকে ‘শুক্লযজুর্ব্বেদ’ বলা হয়, এবং সূর্য্যের রাজ(কেশর) হইতে নির্গত হইয়াছে বলিয়া-কিংবা রাজ অর্থে-অন্ন, সনি অর্থ ধন(সম্পৎ)।-যাজ্ঞবল্ক্যের অন্নসম্পত্তি প্রচুর ছিল, এই কারণে তাঁহার নাম বাজসনি; তাঁহার অধীত বলিয়া ইহার অপর নাম হইয়াছে ‘বাজসনেয়ী সংহিতা‘। যাজ্ঞবল্ক্য আবার এই বেদভাগকে কথ ও মধ্যন্দিন প্রভৃতি শিষ্য সম্প্রদায়ে শিক্ষা দিয়াছিলেন; এই কারণে কথও ‘মাধ্যন্দিন’ প্রভৃতি শাখা সমুহের সৃষ্টি হইয়াছে। এইরূপে শিষ্যসম্প্রদায়ের নামানুসারে কৃষ্ণযজুর্ব্বেদেও ‘চরক’ ও ‘আধ্বর্য্যব’ প্রভৃতি কতকগুলি শাখার আবির্ভাব হইয়াছে।

“মন্ত্র ব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্।” এই শ্রৌত সূত্রানুসারে জানা যায় যে, পূর্ব্বোক্ত বেদসমূহের আরও দুইটি সাধারণ বিভাগ আছে;(১) মন্ত্রভাগ,(২) ব্রাহ্মণভাগ। মন্ত্রভাগ সাধারণতঃ ‘সংহিতা’ নামেই পরিচিত; ইহাতে প্রধানতঃ যাগ-যজ্ঞাদি ক্রিয়ার বিধি, নিষেধ, মন্ত্রও অর্থবাদ প্রভৃতি বিষয় সমূহ সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। আর সংহিতা-ভাগে যে সকল গূঢ়রহস্য প্রচ্ছন্নভাবে নিহিত আছে, মন্দমতি পুরুষেরা পাছে তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে অসমর্থ হইয়া অন্যরূপ কদর্থ করে, এই শঙ্কায়

10

লোকহিতৈষিণী শ্রুতি নিজেই নিজের অভিপ্রায় যে অংশে প্রকাশ করিয়াছেন, সেই অংশের নাম ব্রাহ্মণ। সাধারণতঃ ব্রাহ্মণগণই বেদের তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন, সেই সাদৃশ্য থাকায় বেদের মধ্যে ও ঐ ব্যাখ্যাংশই ‘ব্রাহ্মণ’ নামে অভিহিত হইয়াছে। ব্রাহ্মণ ভাগের মধ্যেও অনেক প্রকার বিভাগ বিদ্যমান আছে। অনাবশ্যক বোধে সে সকলের আলোচনা পরিত্যক্ত হইল। ব্রাহ্মণভাগে প্রধানতঃ স্তোত্র, ইতিবৃত্ত, উপাসনা ও ব্রহ্মবিদ্যা প্রভৃতি বিষয় সমূহ বিন্যস্ত হইয়াছে। এই ব্রহ্মবিদ্যাই বেদের সার বলিয়া ‘বেদান্ত’, এবং অজ্ঞান নিবৃত্তি ও ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায় বলিয়া ‘উপনিষৎ’ সংজ্ঞা লাভ করিয়াছে।

‘উপনিষৎ’ শব্দট উপ+নি পূর্ব্বক ‘যদ’ ধাতু হইতে রিপ্ প্রত্যয়ে নিষ্পন্ন হইয়াছে। তন্মধ্যে উপ অর্থ—সামীপ্য বা সত্বর; ‘নি’—অর্থ—নিশ্চয়, ‘যদ’ অর্থ —প্রাপ্তি ও অবসাসন বা শিথিলীকরণ। যে বিদ্যা দ্বারা মুমুক্ষুগণের শীঘ্র নিশ্চিত- রূপে ব্রহ্মপ্রাপ্তি হয়, কিংবা সংসার-নিদান অজ্ঞান উন্মুলিত করে; সেই ব্রহ্মবিদ্যার নাম ‘উপনিষৎ’। অধিকাংশ উপনিষৎই ব্রাহ্মণ ভাগের অন্তর্গত; সংহিতাভাগে উপনিষদের সংখ্যা অতি অল্প।

আলোচ্য ‘উপনিষৎ’টা শুক্লযজুর্ব্বেদীয় সংহিতাভাগ হইতে প্রাদুর্ভূত; এই কারণে ইহাকে “বাজসনেয়া সংহিতোপনিষৎ” বলা হয় এবং প্রথমেই ‘ঈশা’ শব্দ প্রযুক্ত থাকায় ‘ঈশোপনিষৎ’ বলা হয়। শুক্ল যজুর্ব্বেদীয় সংহিতায় চল্লিশটি মাত্র অধ্যায় আছে। তন্মধ্যে প্রথম ঊনচল্লিশ অধ্যায়ে ‘দর্শপৌর্ণমাস’ যজ্ঞ হইতে ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ’ পর্যন্ত কর্মকাণ্ড বর্ণিত হইয়াছে। অন্তিম এক অধ্যায়ে অষ্টাদশ মন্ত্রে ব্রহ্মবিদ্যা প্রকাশক উপনিষৎ আরব্ধ হইয়াছে।

ইহার প্রথম মন্ত্রে কথিত হইয়াছে যে,—এই যে ধনধান্যপূর্ণ জগৎ পরিদৃষ্ট হইতেছে; ইহা প্রকৃত সত্য নহে; আকাশের ন্যায় সর্ব্বব্যাপী ‘ব্রহ্মদ্বারা ইহা বাহিরে ও অভ্যন্তরে পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে। সুবর্ণময় অলঙ্কারের ভিতরে বাহিরে যেরূপ সুবর্ণ ছাড়া আর কিছুই সত্য নাই, সেইরূপ ব্রহ্ম ছাড়া এই জাগতিক পদার্থেরও কোন অস্তিত্ব নাই, আত্মা ও ব্রহ্ম এক। অতএব সর্ব্বভূতে আত্মদর্শন এবং আত্মাতে সর্ব্বভূত দর্শন করিয়া মুমুক্ষু সাধক জাগতিক সর্ব্ববিষয়ে অভিলাষ পরিত্যাগ করিবে।

1/0

দ্বিতীয় মন্ত্রে কথিত হইয়াছে যে,—যাহারা আত্মজ্ঞানে অক্ষম, ভোগাভিলাষী তাঁহারা যাবজ্জীবন শাস্ত্রবিহিত নিত্য-নৈমিত্তিক কর্ম্ম করিবেন।

তৃতীয় মন্ত্রে বলা হইয়াছে,—যাঁহারা আত্মার অজরামর ভাব বিস্মৃত হইয়া, আত্মাকে জরামরণাদি সম্পন্ন বলিয়া জানে, প্রকৃতপক্ষে তাঁহারা আত্মহন্ (আত্মঘাতী); এবং দেহত্যাগের পর ‘অসূর্য্য’লোকে গমন করেন।

চতুর্থ ও পঞ্চম মন্ত্রে—আত্মস্বরূপ ব্রহ্মের একত্ব, নির্ব্বিকারত্ব ও সর্ব্বব্যাপিত্ব প্রভৃতি প্রকৃতস্বরূপ উপদিষ্ট হইয়াছে।

ষষ্ঠ ও সপ্তম মন্ত্রে—সর্ব্বাত্মভাব ও তৎফল শোক-মোহাদি-নাশের কথা বর্ণিত হইয়াছে।

অষ্টম মন্ত্রে—আত্মার যথাযথ রূপ এবং তৎকর্তৃক সংবৎসরাভিমানী দেবতা- গণকে কর্ম্মাধিকার প্রদানের কথা বর্ণিত হইয়াছে।

নবম, দশম ও একাদশ মন্ত্রে কথিত হইয়াছে যে,—কর্ম্ম ও দেবতা চিন্তার ফল এক নহে, ভিন্ন ভিন্ন; কিন্তু যাহারা আত্মজ্ঞানে অনধিকারী, তাহাদের পক্ষে কেবলই কর্ম্মানুষ্ঠানে কিংবা কেবলই দেবতা চিন্তায় যে অনিষ্ট ফল হয়, এবং জ্ঞান ও কর্ম্মের সহানুষ্ঠানে যে শুভফল হয়, তাহার স্বরূপ নির্দেশ।

দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দ্দশ মন্ত্রে—সমষ্টি ও ব্যষ্টিভূত প্রকৃতি ও হিরণ্যগর্ভাদির পৃথক্ পৃথক্ উপাসনে অনিষ্ট ফল, এবং একত্র উপাসনে শুভফলের স্বরূপনির্দেশ করা হইয়াছে।

পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ মন্ত্রে উপাসকের মৃত্যুকালীন প্রার্থনা প্রদর্শিত হইয়াছে। তন্মধ্যে পঞ্চদশ মন্ত্রে সূর্য্যসমীপে ব্রহ্মলাভের প্রতিবন্ধক নিবারণের প্রার্থনা, ষোড়শ মন্ত্রে সূর্য্যসমীপে তদীয় তেজঃ অপসারণপূর্ব্বক কল্যাণরূপ প্রদর্শনের প্রার্থনা। সপ্তদশমন্ত্রে শরীরের পরিণাম চিন্তা, এবং মনের কর্তব্য নির্দ্ধারণের প্রার্থনা। অষ্টাদশমন্ত্রে মুমূর্ষু সাধকের সুপথে লইয়া যাইবার জন্য প্রার্থনা, এবং স্বীয় পাপ বিমোচনার্থ বারংবার প্রণাম উক্তি।

ভাষ্য-ভূমিকা।

ঈশা বাস্যমিত্যাদয়ো মন্ত্রাঃ কৰ্ম্মস্ববিনিযুক্তাঃ, তেষামকৰ্ম্মশেষস্যাত্মনো যাথাত্ম্য- প্রকাশকত্বাৎ। যাথাত্ম্যং চাত্মনঃ শুদ্ধত্বাপাপবিদ্ধত্বৈকত্বনিত্যত্বাশরীরত্বসর্ব্বগতত্বাদি বক্ষ্যমাণম্। তচ্চ কর্মণা বিরুধ্যেত, ইতি যুক্ত এবৈষাং কৰ্ম্মস্ববিনিয়োগঃ।(১) নহ্যেবংলক্ষণমাত্মনো যাথাত্ম্যমুৎপাদ্যং বিকাৰ্য্যমাপ্যং সংস্কার্য্যং কর্তৃভোক্ত রূপং বা, যেন কৰ্ম্মশেষতা স্যাৎ। সর্ব্বাসামুপনিষদাম্ আত্মযাথাত্ম্যনিরূপণেনৈবোপক্ষয়াৎ, গীতানাং মোক্ষধৰ্মাণাং চৈবংপরত্বাৎ। তস্মাদাত্মনোহনেকত্বকর্তৃত্বভোক্ত ত্বাদি চাশুদ্ধত্ব-পাপবিদ্ধত্বাদি চোপাদায় লোকবুদ্ধিসিদ্ধং কৰ্মাণি বিহিতানি। যো হি কর্মফলেনার্থী, দৃষ্টেন ব্রহ্মবর্চ্চসাদিনা, অদৃষ্টেন স্বর্গাদিনা চ, দ্বিজাতিরহং ন কাণকুজত্বাদ্যনধিকারপ্রযোজকধর্মবানিতি আত্মানং মন্যতে, সোহধিক্রিয়তে কৰ্ম্মসু, ইতি হ্যধিকারবিদো বদন্তি।(২) তস্মাদেতে মন্ত্রা আত্মনো যাথাত্ম্যপ্রকাশনেনাত্ম- বিষয়ং স্বাভাবিকমজ্ঞানং নিবর্তয়ন্তঃ, শোকমোহাদিসংসারধৰ্ম্মবিচ্ছিতিসাধনম্ আত্মৈকত্বাদিবিজ্ঞানমুৎপাদয়ন্তি। ইত্যেবমুক্তাধিকার্যভিধেয়সম্বন্ধপ্রয়োজনান্ মন্ত্রান্ সংক্ষেপতো ব্যাখ্যাস্যামঃ ।

সাধারণতঃ বেদোক্ত মন্ত্রসমূহ যজ্ঞাদি কর্ম্মে প্রযুক্ত হইয়া থাকে; কিন্তু আত্মস্বরূপ-প্রকাশক এই “ঈশাবাস্যম্” প্রভৃতি মন্ত্রসমূহ সেরূপ কোন কর্ম্মে প্রযুক্ত হয় না। পরে ‘নিত্য, শুদ্ধ, সর্ব্বগত, ও অশরীর’

(২)

ইত্যাদি রূপে আত্মার যথাযথ স্বরূপ বর্ণিত হইবে, তাদৃশ স্বভাব- সম্পন্ন আত্মা কোন কর্ম্মের অঙ্গ(ক্রিয়াসাধ্য) হইতে পারেন না; সুতরাং তৎপ্রকাশক ঐ মন্ত্রসকলও যাগাদি কৰ্ম্মে প্রযোজ্য হইতে পারে না। পক্ষান্তরে, তাদৃশ আত্মা কৰ্ম্ম-বিধির অনুকূল নহে; বরং সম্পূর্ণ বিরোধী। এই কারণে ও কৰ্ম্মানুষ্ঠানে ঐ সকল মন্ত্রের প্রয়োগ বা ব্যবহার না হওয়াই যুক্তিযুক্ত। বস্তুতঃ কোন ক্রিয়া দ্বারা উক্ত- প্রকার আত্মার উৎপত্তি, বিকার, প্রাপ্তি, সংস্কার বা কর্তৃত্ব, ভোক্তৃত্ব সম্পাদনও সম্ভবপর হয় না,(৩) যাহাতে তাহার কৰ্ম্মাঙ্গতা সিদ্ধ হইতে পারে।

বিশেষতঃ সমস্ত উপনিষৎ ও গীতা প্রভৃতি মোক্ষশাস্ত্র(৪) এক- মাত্র তাদৃশ আত্মস্বরূপ প্রকাশেই পরিসমাপ্ত।[সুতরাং ঈশাবাস্যাদি মন্ত্রের কর্ম্মাঙ্গত্ব নির্দেশ করা অসম্ভব]। অতএব বুঝিতে হইবে যে,

(৩)

‘আত্মা কর্তা ভোক্তা পাপপুণ্যযুক্ত ও শরীরভেদে ভিন্ন ভিন্ন’ ইত্যাদি- রূপে অজ্ঞ জনের স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ় ধারণানুসারে শাস্ত্রে কর্মবিধি-সমূহ বিহিত হইয়াছে। অধিকার-তত্ত্ববিদগণ বলিয়া থাকেন যে, যে লোক ঐহিক ব্রহ্মণ্যতেজঃ(শক্তি) ও পারলৌকিক স্বর্গাদি ফল প্রাপ্তির অভিলাষী হইয়া আপনাকে দ্বিজাতি ও অধিকার-বিরোধী কাণত্ব- কুজত্বাদি দোষ-রহিত বলিয়া বিবেচনা করে, সেই লোকই অভিলষিত কর্ম করিতে অধিকারী হয়।(*) অতএব বুঝিতে হইবে যে, এই মন্ত্র- সকল আত্মার যথাযথ স্বরূপ প্রকাশ করিয়া, ঐ আত্ম-বিষয়ে লোক- প্রসিদ্ধ কর্তৃত্বাদি ভ্রম অপনয়ন করে এবং শোক-মোহাদিময় সংসার সমুচ্ছেদ করিয়া, লোকের হৃদয়ে আত্মৈকত্ব-জ্ঞান সমুৎপাদন করিয়া দেয়। শোকমোহাদিময় সংসারোচ্ছেদাভিলাষী পুরুষ ইহার অধিকারী। আত্মার যথার্থ স্বরূপ ইহার প্রতিপাদ্য। উক্ত বিষয়ের সহিত এই শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য-প্রতিপাদক ভাব সম্বন্ধ, অর্থাৎ আত্ম- স্বরূপ প্রতিপাদ্য, এই শাস্ত্র তাহার প্রতিপাদক। শোকমোহাদিময় সংসারোচ্ছেদপূর্ব্বক আত্মৈকত্ব-জ্ঞানোৎপাদন ইহার প্রয়োজন। এবং- বিধ অধিকারী, বিষয়, সম্বন্ধ ও প্রয়োজন-সম্পন্ন এই মন্ত্র সকলের আমরা(ভাষ্যকার) সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করিব ॥

শুক্লযজুর্ব্বেদীয়া বাজসনেয়সংহিতোপনিষৎ বা

ঈশোপনিষৎ —oOoOo—

শঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা।

ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে॥

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ হরিঃ ওঁ ॥

ঈশা বাশ্যমিদং সর্ব্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।

তেন ত্যক্তেন ভূঞ্জীথ; মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্ ধনম্ ॥ ১ ॥

শান্তি পাঠ।—যে সকল পদার্থ, ইন্দ্রিয়ের অগোচর(সূক্ষ্ম), তাহা ব্রহ্ম দ্বারা পূর্ণ বা ব্যাপ্ত, যে সকল পদার্থ ইন্দ্রিয় গোচর তাহাও ব্রহ্ম দ্বারা ব্যাপ্ত এবং এই সমস্ত জগৎই পরিপূর্ণ ব্রহ্ম হইতে অভিব্যক্ত হইয়াছে; আর সেই পূর্ণ স্বভাব ব্রহ্মের পূর্ণতা জগব্যাপ্ত হইলেও তাহার পূর্ণতার হানি হয় না।

প্রণম্য গুরুপাদাজং স্ফূজা শঙ্কর-সম্মতিম্।

ঈশোপনিষদাং ব্যাখ্যা। সরলাখ্যা বিত্যান্ ॥

ঈশেতি। জগত্যাং(পৃথিব্যাং) যৎ কিঞ্চ(যং বিঞ্চিৎ) জগৎ(নশ্বরং চরাচরং বস্তুজাতং), ইদং সর্ব্বং ঈশা(পরমেশ্বরেণ) বাস্যং(সত্তা-চৈতন্যাভ্যাং ব্যাপ্যম্)। তেন(হেতুনা) ত্যক্তেন(ত্যাগেন সন্ন্যাসেন-) ভুঞ্জীথাঃ(আত্মানং পালয়)। ফস্য স্বিৎ(কস্যচিৎ) ধনং মা গৃধঃ(মা অভিকাজ্জীঃ)।

জগতে যে কিছু পদার্থ আছে, তৎসমস্তই আত্মরূপী পরমেশ্বর দ্বারা আচ্ছাদন করিবে, অর্থাৎ একমাত্র পরমেশ্বরই সত্য, জগৎ তাহাতে কল্পিত— মিথ্যা, এই জ্ঞানের দ্বারা জগতের সত্যতা-বুদ্ধি বিলুপ্ত করিবে।[তাহাতেই তোমার হৃদয়ে আসক্তি-ত্যাগরূপ সন্ন্যাস আসিবে,] সেই ত্যাগ বা সন্ন্যাস

৬ ঈশোপনিষৎ।

দ্বারা আত্মার অদ্বৈত নির্ব্বিকার ভাব রক্ষা কর; কাহারো ধনে আকাঙ্ক্ষা করিও না ॥ ১।]

শাঙ্করভাষ্যম্।

ঈশা বাস্যমিত্যাদি। ঈশা-ঈষ্টে ইতীট্, তেন--ঈশা। ঈশিতা পরমেশ্বরঃ পরমাত্মা সর্ব্বস্থ্য। স হি সর্ব্বমীষ্টে সর্ব্বজন্ত নামাত্মা সন্(৫) প্রত্যগাত্মতয়া, তেন স্বেন রূপেণ আত্মনা ঈশা বাস্যমাচ্ছাদনীয়ম্। কিম্? ইদং সর্ব্বং যৎ কিঞ্চ, যৎ কিঞ্চিৎ জগত্যাং পৃথিব্যাং জগৎ, তৎ সর্ব্বং স্বেন আত্মনা ঈশেন প্রত্যগাত্মতয়া অহমেবেদং সর্ব্বমিতি পরমার্থসত্যরূপেণানৃতমিদং সর্ব্বং চরাচরমাচ্ছাদনীয়ং স্বেন পরমাত্মনা। যথা চন্দনাগর্ব্বাদেরুদকাদিসম্বন্ধজ ক্লেদাদিজমৌপাধিকং দৌর্গন্ধ্যং তৎস্বরূপ-নিঘর্ষণেন আচ্ছাদ্যতে স্বেন পারমার্থিকেন গন্ধেন, তদ্বদেব হি স্বাত্মন্যধ্যস্তং স্বাভাবিকং কর্তৃত্বভোক্ত ত্বাদিলক্ষণং জগৎ- দ্বৈতরূপং জগত্যাং পৃথিব্যাং; জগত্যা- মিত্যুপলক্ষণার্থত্বাৎ সর্ব্বমেব নামরূপকর্মাখ্যং বিকারজাতং পরমার্থসত্যাত্মভাবনয়া ত্যক্তং স্যাৎ। এবমীশ্বরাত্মভাবনয়া যুক্তস্য পুত্রাদ্যেষণাত্রয়সন্ন্যাস এবাধিকারো, ন কর্মসু। তেন ত্যক্তেন ত্যাগেনেত্যর্থঃ। ন হি ত্যক্তো, মৃতঃ পুত্রো বা ভৃত্যো বা আত্মসম্বন্ধিতায়া অভাবাদাত্মানং পালয়তি, অতস্ত্যাগেনেত্যয়মেব বেদার্থঃ। ভুঞ্জীথাঃ পালয়েথাঃ। এবং ত্যক্তৈষণস্থং মা গৃধঃ গৃধিমাকাঙ্ক্ষাং মা কার্ষীর্ধনবিষয়াম্। কস্য স্বিৎ ধনং কস্যচিৎ পরস্য স্বস্য বা ধনং মা কাঙ্ক্ষীরিত্যর্থঃ। স্বিদিত্যনর্থকো নিপাতঃ। অথবা, মা গৃধঃ, কস্মাৎ? কস্যস্বিৎ ধনমিত্যাক্ষেপার্থঃ। ন কস্যচিৎ ধনমস্তি, যদ্ গৃধ্যেত; আত্মৈবেদং সৰ্ব্বম্, ইতীশ্বরভাবনয়া সর্ব্বং ত্যক্তম্, অত আত্মন এবেদং সর্ব্বমাত্মৈব চ সর্ব্বমতো মিথ্যাবিষয়াং গৃধিং মা কার্ষীরিত্যর্থঃ ॥ ১॥

ভাষ্যানুবাদ।

‘ঈশ’ ধাতুর অর্থ ঐশ্বর্য্য বা শাসন-ক্ষমতা; যিনি এই জগতের শাসনে সমর্থ পরমাত্মা পরমেশ্বর, তিনিই এখানে ‘ঈশা’-পদের

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৭

প্রতিপাদ্য। তিনি প্রত্যরূপে(জীবরূপে) সর্ব বস্তুর অভ্যন্তরে থাকিয়া, সমস্ত জগৎ যথানিয়মে শাসিত ও পরিচালিত করিতেছেন। সেই সর্বাত্মরূপী পরমেশ্বর দ্বারা পৃথিবীস্থ সমস্ত বস্তুকে আচ্ছাদিত করিবে,-সর্বত্র তাঁহার সত্তা উপলব্ধি করিবে।[অভিপ্রায় এই যে.] জগৎকারণ পরমেশ্বরই জীবরূপে সর্বদেহে বর্তমান আছেন; এবং তাঁহার সংকল্পপ্রসূত স্থাবর-জঙ্গমময় এই জগৎ বস্তুতঃ মিথ্যা হইয়াও তাঁহাকে আশ্রয় করিয়াই সত্যের ন্যায় প্রতিভাত হইতেছে। সেই পরমাত্মরূপী আমিই এই জগৎ, আমার সত্তাই জগতের সত্তা, তদ্ভিন্ন জগতের আর পৃথক্ সত্তা নাই; এইরূপ যথার্থ সত্য জ্ঞানের দ্বারা জগতের সত্যতা ঢাকিয়া ফেলিবে, অর্থাৎ ‘জগৎ সত্য’ বলিয়া যে ভ্রম ছিল, তাহা বিলুপ্ত করিবে। যেমন চন্দন ও অগরুপ্রভৃতি গন্ধদ্রব্যসমূহ জলাদি-সংস্পর্শে কখন কখন দুর্গন্ধযুক্ত বলিয়া মনে হয় সত্য; কিন্তু ঘর্ষণ করিলেই তাহার স্বভাবসিদ্ধ মনোহর সৌরভ প্রকাশ পায়, এবং আগন্তুক দুর্গন্ধ দূর করিয়া দেয়, ঠিক সেইরূপ, কর্তৃত্ব-ভোক্তত্বপূর্ণ, ভিন্ন ভিন্ন নাম(সংজ্ঞা), রূপ(আকৃতি) ও চেষ্টা বা ক্রিয়া-সম্পন্ন এই সমস্ত জগৎ নিজে অসত্য হইয়াও, যথার্থ সত্যস্বরূপ পরমেশ্বরের আশ্রয়ে থাকিয়া সত্য বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে মাত্র; বস্তুতঃ উহা মিথ্যা—অধ্যস্ত মাত্র; এইরূপ সত্য ভাবনা দ্বারা জগতের সত্যতা-ভ্রম নিরস্ত হইয়া যায়।

উক্তরূপে যে লোক আপনাকে ঈশ্বরাংশ বলিয়া বুঝিতে পারে, তাহার আর পুত্র, সম্পৎ বা স্বর্গাদি লোক-লাভের এষণা বা কামনা থাকে না; সুতরাং তদর্থ কর্ম্মেও অধিকার থাকে না; একমাত্র বাসনা- ত্যাগরূপ সন্ন্যাসেই অধিকার থাকে; তাহার ফলে সেই লোক তখন সংন্যাস গ্রহণ করে। অতএব, তুমি তাদৃশ ভাবাপন্ন হইয়া, সংন্যাস দ্বারা আত্মাকে পরিপালন কর; অর্থাৎ জগতের মিথ্যাত্ব ভারনাদ্বারা

৮ ঈশোপনিষৎ।

আত্মার আত্মত্ব(নির্বিকারত্ব ও সত্যত্ব প্রভৃতি ভাবগুলি) রক্ষা কর। তুমি এইরূপে বাসনা পরিত্যাগপূর্ব্বক নিজের কিংবা পরের, কাহারো ধনের আকাঙ্ক্ষা করিও না। অথবা, ধন কাহার?—ধন ত কাহারও নহে, যাহা আকাঙ্ক্ষা করিতে পারা যায়। আত্মাই সমস্ত জগৎ, এবং সমস্ত জগৎই আত্মরূপ; এইরূপ পরমেশ্বর-চিন্তা দ্বারা যখন সমস্ত বস্তুই মিথ্যা বলিয়া পরিত্যাগ করিয়াছ, তখন আর সেই মিথ্যা বিষয়ে আকাঙ্ক্ষা বা লোভ করা সঙ্গত হয় না।(৬) মন্ত্রে যে, ‘স্বিৎ’ কথাটি আছে, উহা অর্থহীন নিপাত শব্দ(বাক্যের শোভাবর্দ্ধকমাত্র) ॥ ১ ॥

কুর্ব্বন্নেবেহ কর্ম্মাণি জিজীবিষেৎ শতং সমাঃ। এবং ত্বয়ি নান্যথেতোহস্তি ন কৰ্ম্ম লিপ্যতে নরে ॥২॥

[ যস্ত সাক্ষাৎ পরমেশ্বরারাধনে অশক্তঃ, সঃ] কর্মাণি(বর্ণাশ্রমবিহিতানি) কুর্ব্বন্ (সম্পাদয়ন্) এব, শতং(শতসংখ্যকাঃ) সমাঃ(সংবৎসরান্) ইহ(অস্মিন্ লোকে) জিজীবিষেৎ(জীবিতুম্ ইচ্ছেৎ)। এবম্(এবং প্রকারে) ত্বয়ি(জিজী বিষতি) নরে, ইতঃ(এতস্মাৎ বর্তমানাৎ প্রকারাৎ) অন্যথা(প্রকারান্তরং) ন অস্তি,[যেন প্রকারেণ জ্ঞানোৎপত্তিপ্রতিবন্ধকং] কৰ্ম্ম ন লিপ্যতে(ত্বং জ্ঞানোৎপত্তিপ্রতিবন্ধকেন কৰ্ম্মণা ন লিপ্যসে) ॥

শাস্ত্রোক্ত কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াই শত বৎসর বাঁচিয়া থাকিবে। তুমি যখন

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৯

মনুষ্যত্বাভিমানী, তখন তোমার পক্ষে অন্য এমন কোন উপায় নাই, যাহাতে কোন কর্ম্মই তোমাতে লিপ্ত না হইতে পারে॥ ২

শাঙ্করভাষ্যম্।

এবমাত্মবিদঃ পুত্রাদ্যেষণাত্রয়সন্ন্যাসেন আত্মজ্ঞাননিষ্ঠতয়া আত্মা রক্ষিতব্য ইত্যেষ বেদার্থঃ। অথেতরস্য অনাত্মজ্ঞতয়া আত্মগ্রহণাশক্তস্য ইদমুপদিশতি মন্ত্রঃ, -কুর্ব্ব- ন্নেবেতি। কুর্ব্বন্ এব ইহ নির্বর্ত্তয়ন্ এব কর্মাণি অগ্নিহোত্রাদীনি জিজীবিষেৎ জীবিতুমিচ্ছেৎ শতং শতসংখ্যাকাঃ সমাঃ সম্বৎসরান্। তাবদ্ধি পুরুষস্থ পরমায়ুনিরূ- পিতম্(ক)। তথা চ প্রাপ্তানুবাদেন যজ্জিজীবিযেচ্ছতং বর্ষাণি, তৎ কুর্ব্বন্নেব কর্মাণি ইত্যেতদ্বিধীয়তে। এবম্-এবম্প্রকারেণ ত্বয়ি জিজীবিষতি নরে নরমাত্রাভিমানিনি ইত এতম্মাদগ্নিহোত্রাদীনি কৰ্ম্মানি কুর্ব্বতো বর্তমানাৎ প্রকারাদন্যথা প্রকারা- ন্তরং নাস্তি, যেন প্রকারেণ অশুভং কৰ্ম্ম ন লিপ্যতে; কৰ্মণা ন.লিপ্স্যসে ইত্যর্থঃ। অতঃ শাস্ত্রবিহিতানি কর্মাণি অগ্নিহোত্রাদীনি কুর্ব্বন্নেব জিজীবিষেৎ। কথং পুন- রিদমবগম্যতে,-পূর্ব্বেণ মন্ত্রেণ সন্ন্যাসিনো জ্ঞাননিষ্ঠোক্তা, দ্বিতীয়েন তদশক্তস্ত কর্মনিষ্ঠেতি? উচ্যতে, -জ্ঞানকৰ্ম্মণোর্বিরোধং পর্বতবদকম্প্যং যথোক্তং ন স্মরসি কিম্? ইহাপ্যুক্তম্--যো হি জিজীবিযেৎ, স কৰ্ম্ম কুর্ব্বন্। “ঈশা বাস্যমিদং সর্ব্বস্, ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথাঃ, মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্” ইতি চ। “ন জীবিতে মরণে বা গৃধিং কুব্বীতারণ্যমিয়াৎ” ইতি চ পদম্। “ততো ন পুনরিয়াৎ,” ইতি সন্ন্যাসশাসনাৎ। উভয়োঃ ফলভেদঞ্চ বক্ষ্যতি,-“ইমৌ দ্বাবেব পন্থানাবনুনিষ্ক্রান্ততরৌ ভবতঃ,- ক্রিয়াপথশ্চৈব পুরস্তাৎ, সন্ন্যাসশ্চোত্তরেণ ‘নিবৃত্তিমার্গেণ এষণাত্রয়স্য ত্যাগঃ।” তয়োঃ সন্ন্যাসপথ এবাতিরেচয়তি,-“ন্যাস এবাত্যরেচয়ৎ” ইতি চ তৈত্তিরীয়কে। “দ্বাবিমাবথ পন্থানো যত্র বেদাঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ। প্রবৃত্তিলক্ষণো ধর্মো নিবৃত্তশ্চ(খ) বিভাবিতঃ ॥” ইত্যাদি পুত্রায় বিচার্য্য নিশ্চিতমুক্তং ব্যাসেন বেদাচার্য্যেণ ভগবতা। বিভাগঞ্চানয়োদর্শয়িষ্যামঃ ॥ ২॥

ভাষ্যানুবাদ।

পূর্ব্ব মন্ত্রে প্রতিপাদিত হইয়াছে যে, যাহারা আত্মজ্ঞানে অধিকারী, তাহারা পুত্র, বিত্ত ও স্বর্গাদি লোক লাভের আশা(বাসনা)

(ক) ‘নিবৃত্তৌ চ’ ইতি বহুযু পুস্তকেষু পাঠঃ।(খ) মায়ুরুচিতম্’ ইতি কচিৎ পাঠঃ।

১০ ঈশোপনিষৎ।

পরিত্যাগ পূর্বক সন্ন্যাস গ্রহণ করিবে, এবং আত্মজ্ঞানে তৎপর থাকিয়া, আত্মার প্রকৃত তত্ত্ব উপলব্ধি করিবে; কিন্তু যাহারা আত্মার প্রকৃত স্বরূপ গ্রহণে অসমর্থ, এই শ্রুতি তাহাদের সম্বন্ধে কর্তব্য নির্দেশ করিয়া বলিতেছেন যে, আত্মজ্ঞানে অনধিকারী ব্যক্তিগণ অগ্নিহোত্রাদি(অগ্নিহোত্র একপ্রকার যজ্ঞ) নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াই শতবর্ষ জীবন ধারণের ইচ্ছা করিবে, অর্থাৎ যাবজ্জীবন শাস্ত্রবিহিত নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিবে। মনুষ্যের আয়ুঃ স্বভাবতই শতবর্ষ নির্দিষ্ট রহিয়াছে; সুতরাং তদ্বিষয়ে বিধি নহে—শুধু অনুবাদ মাত্র।(পূর্ব্বসিদ্ধ বা কথিত বিষয়ের পুনঃকথনের নাম অনুবাদ, অনুবাদ কখনই বিধি হইতে পারে না। অতএব বুঝিতে হইবে যে, মানুষ যে শতবর্ষকাল বাঁচিবে, ততকাল অবশ্যই শাস্ত্রবিহিত কৰ্ম্ম করিবে, কখনই কৰ্ম্ম হইতে বিরত হইবে না।) তুমি যখন কেবলই নরত্বাভিমানী—আত্মজ্ঞানরহিত, তখন তোমার পক্ষে উক্তপ্রকার কর্মানুষ্ঠান-সহকারে জীবনধারণ ভিন্ন এমন আর কোনও উপায় নাই, যাহা দ্বারা তুমি অশুভকর্ম্মের আক্রমণ হইতে আপনাকে রক্ষা করিতে পার। অতএব, তুমি শাস্ত্র-বিহিত অগ্নি- হোত্রাদি কর্ম্মের অনুষ্ঠান অবশ্য, অবশ্য করিবে।

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, প্রথম মন্ত্রে যে, কেবল সন্ন্যাসীর সম্বন্ধেই জ্ঞান-নিষ্ঠা উক্ত হইয়াছে, আর দ্বিতীয় মন্ত্রে কেবল জ্ঞানাসমর্থ পুরুষের পক্ষেই কর্মনিষ্ঠা বিহিত হইয়াছে; কিন্তু এক সন্ন্যাসীর পক্ষেই যে, জ্ঞান ও কৰ্ম্মনিষ্ঠা বিহিত হয় নাই, ইহা কিসের দ্বারা জানা যায়? ভাষ্যকার বলিতেছেন যে, হাঁ ঐ প্রভেদ জানিবার উপায় আছে; জ্ঞান ও কৰ্ম্মে যে বিরোধ, তাহা পর্বতের ন্যায় সুদৃঢ় ও অনিবার্য্য। এ কথা অন্যত্রও উক্ত আছে, স্মরণ করিতে পার না কি?. আর এখানেও সে কথা উক্ত হইয়াছে। বলা হইয়াছে—‘যে লোক জীবনের আশা করে,

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ১১

সে অবশ্যই কৰ্ম্ম করিবে,’ সুতরাং এ স্থলে জীবনেচ্ছু ব্যক্তির পক্ষে কৰ্ম্ম বিহিত হইয়াছে, আর প্রথম মন্ত্রে কৰ্ম্ম-সন্ন্যাস ও ধনাকাঙ্ক্ষা পরি- ত্যাগের উপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। একই লোকের পক্ষে ত কৰ্ম্মত্যাগ ও কৰ্মানুষ্ঠানের বিধি হইতে পারে না; কারণ উহা স্বভাব-বিরুদ্ধ। বিশেষতঃ, শ্রুতি বলিয়াছেন যে, ‘সন্ন্যাসী পুরুষ জীবন বা মরণের আকাঙ্ক্ষা করে না,[কিন্তু কর্মী তাহা করে।] সন্ন্যাসী পুরুষ অরণ্যে গমন করিবে, সেখান হইতে আর ফিরিয়া আসিবে না‘। ইহাই বেদোক্ত সন্ন্যাসাশ্রমের বিশেষ নিয়ম। কৰ্ম্ম এবং সন্ন্যাসের ফলেও যে, বিশেষ পার্থক্য আছে, তাহা পরে কথিত হইবে।

বেদাচার্য্য, ভগবান্ বেদব্যাসও বিশেষ বিবেচনা করিয়া পুত্রের নিকট এই সিদ্ধান্তেরই উপদেশ প্রদান করেন যে, ‘[অভীষ্ট ফললাভের জন্য] এই দুইটি বিভিন্ন পথ বা উপায়, সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃত্ত হইয়াছে; একটি ক্রিয়াপথ(কর্মমার্গ), অপরটি জ্ঞানপথ, অর্থাৎ নিবৃত্তিমার্গ—সন্ন্যাস। নিবৃত্তিমার্গে পুত্র, সম্পৎ, ও স্বর্গাদি লোক প্রাপ্তির কামনা ত্যাগ করিতে হয়। ‘সন্ন্যাসই[কর্মকে] অতিক্রম করিয়াছিল’; এই তৈত্তিরীয় শ্রুতি অনুসারেও জানা যায় যে, কর্ম অপেক্ষা সন্ন্যাসই শ্রেষ্ঠ। ‘সমস্ত বেদ এই দুইটিমাত্র পথ বা শ্রেয়ো- লাভের উপায় অবলম্বন করিয়া আছে;—একটি প্রবৃত্তি পথ, যাহাতে কর্মানুষ্ঠান করিতে হয়, অপরটি নিবৃত্তি পথ, ইহাতে কৰ্ম্ম ত্যাগ করিতে হয়’, ইত্যাদি। পরে আমরাও কৰ্ম্ম ও সন্ন্যাসের স্বরূপগত বিভাগ প্রদর্শন করিব ॥ ২॥

অসূর্য্যা নাম তে লোকা অন্ধেন তমসাবৃতাঃ। তাস্তে প্রেত্যাভিগচ্ছন্তি যে কে চাত্মহনো জনাঃ ॥৩॥

অসুর্য্যাঃ(অসুরযোগ্যাঃ) নাম(ইতি প্রসিদ্ধাঃ) অন্ধেন(অদর্শনাত্মকেন) তমসা(অন্ধকারেণ) আবৃতাঃ(আচ্ছাদিতাঃ) তে[যে] লোকাঃ[সন্তীতিশেষঃ]।

১২ ঈশোপনিষৎ।

যে কে চ আত্মহনঃ(আত্ম-তত্ত্ববোধরহিতাঃ, সুতরাং আত্মনাশকাঃ জনাঃ; তে প্রেত্য(মৃত্বা—দেহত্যাগানন্তরম্) তান্(লোকান্) অভিগচ্ছন্তি(প্রাপ্নুবন্তি)। আত্মহন্(আত্মজ্ঞান-বিমুখ) যে কোন লোক,(অর্থাৎ তাঁহারা সকলেই) মৃত্যুর পর অন্ধ-তমসাচ্ছন্ন অসুর্য্য(অসুরযোগ্য) লোকে গমন করে॥ ৩॥}

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

অথেদানীমবিদ্বন্নিন্দার্থোহয়ং মন্ত্র আরভ্যতে। অসুৰ্যাঃ পরমাত্মভাবমদ্বয়মপেক্ষ্য দেবাদয়োহপ্যসুরাঃ, তেষাঞ্চ স্বভূতা লোকা অসুর্যা নাম। নামশব্দোহনর্থকো নিপাতঃ। তে লোকাঃ কৰ্ম্মফলানি,-লোক্যন্তে দৃশ্যন্তে ভুজ্যন্ত ইতি জন্মানি। অন্ধেন অদর্শনাত্মকেনাজ্ঞানেন তমসা আবৃতা আচ্ছাদিতাঃ, তান্ স্থাবরান্তান্ প্রেত্য ত্যক্ত্বা ইমং দেহমভিগচ্ছন্তি যথাকৰ্ম্ম যথাশ্রুতম্। যে কে চাত্মহনঃ, আত্মানং ঘ্নন্তী- ত্যাত্মহনঃ। কে তে জনাঃ? যেহবিদ্বাংসঃ। কথং তে আত্মানং নিত্যং হিংসন্তি? অবিদ্যাদোষেণ বিদ্যমানস্য আত্মনস্তিরস্করণাৎ। বিদ্যমানস্যাত্মনো যৎ কার্য্যং ফলমজরা- মরত্বাদিসংবেদনলক্ষণম্, তৎ হতস্যেব তিরোভূতং ভবতীতি প্রাকৃতাবিদ্বাংসো জনা আত্মহন উচ্যন্তে। তেন হ্যাত্মহননদোষেণ সংসরন্তি তে ॥ ৩ ॥ ভাষ্যানুবাদ।

ভাষ্যানুবাদ।

অতঃপর, আত্মজ্ঞান-রহিত পুরুষদিগের নিন্দাপ্রদর্শনার্থ এই মন্ত্র আরব্ধ হইতেছে। যাহারা আত্মহন, অর্থাৎ আত্ম-জ্ঞানহীন অজ্ঞলোক, তাহারা মৃত্যুর পর ঘোরতর অন্ধকারাচ্ছন্ন অসুর্য্য—অসুরগণের গন্তব্য লোকে গমন করে। মন্ত্রোক্ত ‘নাম’ শব্দটি অর্থ হীন।

অদ্বৈত পরমাত্মজ্ঞানে বিমুখ হইয়া কেবলই প্রাণ ধারণে ও পান- ভোগে রত থাকায় দেবতাগণও ‘অসুর’ নামে অভিহিত হন। ‘লোক’ অর্থ—যাহা অবলোকন করা যায়, অর্থাৎ অনুভব বা ভোগ করা যায়, সেই কর্ম্ম ফল—বিভিন্ন প্রকার জন্ম। ‘আত্মহন’ অর্থ—আত্মা স্বপ্রকাশরূপে বিদ্যমান সত্ত্বেও যাহারা অবিদ্যাবশতঃ তাহার অজর, অমরাদি ভাবগুলি অনুভব করিতে অক্ষম। বস্তুতই তাহাদের নিকট আত্মা সর্ব্বদাই তিরোহিত—অবিজ্ঞাত থাকে; সুতরাং নিহতের মতই

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ১৩

অপ্রকাশিত থাকে, এই কারণে আত্মজ্ঞানহীন জনগণকে ‘আত্মহন’ বলা হইয়াছে। তাহারা দেহত্যাগের পর এই আত্মহনন অপরাধেই পূর্ব্বানুষ্ঠিত শুভাশুভ কৰ্ম্ম ও দেবতা চিন্তা(দেবতার উপাসনা) অনুসারে স্থাবর—বৃক্ষ-তৃণাদিরূপে জন্ম ধারণ করে, এবং এইরূপে পুনঃ পুনঃ সংসারে আগমন করে ॥ ৩ ॥

অনেজদেকং মনসো জবীয়ো নৈনদ্দেবা আপ্নুবন্ পূর্ব্বমর্ষৎ। তদ্ধাবতোহন্যানত্যেতি তিষ্ঠৎ, তস্মিন্নপো মাতরিশ্বা দধাতি ॥ ৪ ॥

[তৎ আত্মতত্ত্বং] অনেজৎ(স্পন্দনবর্জিতম্), একং(সদৈকরূপং,) মনসঃ জবীয়ঃ(বেগবত্তরম্), দেবাঃ(দ্যোতনাৎ দেবাঃ-প্রকাশময়ানি ইন্দ্রিয়াণি) পূর্ব্বম্ অর্ষৎ(প্রথমমেব গতম্) এনৎ(এতৎ আত্মতত্ত্বং) ন আপ্নুবন্(প্রাপ্তবন্তঃ)। তৎ(আত্মতত্ত্বং) তিষ্ঠৎ(স্থিরম্ অপি) ধাবতঃ(দ্রুতং গচ্ছতঃ) অন্যান্(মনো- বাগাদীন্) অত্যেতি(অতীত্য গচ্ছতি)। তস্মিন্(আত্মচৈতন্যে সতি, তদধিষ্ঠিত- ইত্যর্থঃ) মাতরিশ্বা(মাতরি অন্তরিক্ষে শ্বয়তি-গচ্ছতি যঃ সঃ বায়ুঃসূত্রাত্মা)। অপঃ(বারিবর্ষণাদীনি কর্মাণি) দধাতি(বিভজ্য ধারয়তীত্যর্থঃ)।

সেই আত্মা স্বয়ং এক ও অনেজৎ—নিশ্চল, অথচ মন অপেক্ষাও সমধিক বেগবান্। মাতরিশ্বা(কর্মফল-বিধাতা হিরণ্যগর্ভ) তাঁহার সাহায্যেই জীবের সর্ব্বপ্রকার কর্মফল সম্পাদন করিয়া থাকেন ॥ ৪ ॥]

শাঙ্করভাষ্যম্।

যস্যাত্মনো হননাদবিদ্বাংসঃ সংসরন্তি, তদ্বিপর্যয়েণ বিদ্বাংসো জনা মুচ্যন্তে, তে ন আত্মহনঃ। তৎ কীদৃশমাত্মতত্ত্বমিত্যুচ্যতে,-অনেজদিতি। অনেজৎ-ন এজৎ। এজ কম্পনে। কম্পনং চলনং স্বাবস্থাপ্রচ্যুতিঃ, তদ্বর্জিতং সর্ব্বদৈকরূপমিত্যর্থঃ। তচ্চৈকং সর্ব্বভূতেষু। মনসঃ সঙ্কল্পাদিলক্ষণাৎ জবীয়ো জববত্তরম্। কথং বিরুদ্ধমুচ্যতে,-ধ্রুবং নিশ্চলমিদং, মনসো জবীয় ইতি চ। নৈষ দোষঃ, নিরুপাধ্যুপাধিমত্বেনোপপত্তেঃ। তত্র নিরুপাধিকেন স্বেন রূপেণোচ্যতে

১৪ ঈশোপনিষৎ।

অনেজদেকমিতি। মনসোহন্তঃকরণস্য সঙ্কল্প-বিকল্পলক্ষণস্যোপাধেরনুবর্তনাৎ ইহ দেহস্থস্য মনসো ব্রহ্মলোকাদি দূরগমনং সঙ্কল্পেন ক্ষণমাত্রাস্তবর্তীত্যতো মনসো জবিষ্ঠত্বং লোকে প্রসিদ্ধম্। তস্মিন্মনসি ব্রহ্মলোকাদীন্ দ্রুতং গচ্ছতি সতি প্রথমং প্রাপ্ত ইবাত্ম-চৈতন্যাবভাসো গৃহ্যতে, অতো মনসো জবীয় ইত্যাহ। নৈনদ্দেবাঃ দ্যোতনাৎ দেবাঃ চক্ষুরাদীনি ইন্দ্রিয়াণ্যেতৎ প্রকৃতমাত্মতত্ত্বং নাগ্ন বন্ ন প্রাপ্তবন্তঃ। তেভ্যো মনো জবীয়ো মনোব্যাপারব্যবহিতত্বাৎ। আভাসমাত্রমপ্যাত্মনো নৈব দেবানাং বিষয়ীভবতি; যম্মাজ্বনান্মনসোহপি পূর্ব্বমর্ষৎ পূর্ব্বমেব গতম্, ব্যোমবদ্বাপিত্বাৎ। সর্বব্যাপি তদাত্মতত্ত্বং সর্বসংসারধৰ্ম্মবজ্জিতং স্বেন নিরুপা- ধিকেন স্বরূপেণাবিক্রিয়মেব সদুপাধিকৃতাঃ সর্ব্বাঃ সংসারবিক্রিয়া অনুভবতীব অবিবেকিনাং মূঢ়ানামনেকমিব চ প্রতিদেহং প্রত্যবভাসত ইত্যেতদাহ, তদ্ধাবতো দ্রুতং গচ্ছতোহন্যান্ আত্মবিলক্ষণান্ মনোবাগিন্দ্রিয়প্রভূতীন্ অত্যেতি অতীত্য গচ্ছতীব। ইবার্থং স্বয়মেব দর্শয়তি,-তিষ্ঠদিতি। স্বয়মবিক্রিয়মেব সদিত্যর্থঃ। তস্মিন্নাত্মতত্ত্বে সতি নিত্যচৈতন্যস্বভাবে, মাতরিশ্বা মাতরি অন্তরিক্ষে শ্বয়তি গচ্ছতীতি মাতরিশ্বা বায়ুঃ সর্বপ্রাণভূৎ ক্রিয়াত্মকঃ, যদাশ্রয়াণি কার্য্য- করাজাতানি যস্মিন্নোতানি প্রোতানি চ, যৎ সূত্রসংজ্ঞকং সর্বস্য জগতো বিধা- রয়িতৃ, স মাতরিশ্বা অপঃ কর্মাণি প্রাণিনাং চেষ্টালক্ষণানি * অগ্ন্যাদিত্য- পর্জন্যাদীনাং জ্বলন-প্রকাশাভিবর্ষণাদিলক্ষণানি দধাতি বিভজতীত্যর্থঃ। ধারয়তীতি বা; “ভীষাস্মাদ বাতঃ পবতে” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ। সর্ব্বা হি কার্য্যকারণা- দিবিক্রিয়া নিত্যচৈতন্যাত্মস্বরূপে সর্ব্বাস্পদভূতে সত্যেব ভবন্তীত্যর্থঃ ॥ ৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অজ্ঞ পুরুষগণ যে আত্মার হিংসা ফলে অনবরত জন্ম-মরণ প্রবাহ প্রাপ্ত হয়, জ্ঞানিগণ আবার সেই আত্মারই স্বরূপানুসন্ধানের ফলে মোক্ষ লাভ করেন; কারণ, তাঁহারা কখনও পূর্ব্বোক্ত প্রকারে আত্মার হিংসা করেন না। ইতঃপর সেই আত্মার স্বরূপ বর্ণিত হইতেছে,—

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ১৫

‘এজ’ ধাতুর অর্থ কম্পন বা চলন—স্থান-প্রচ্যুতি; যাহার স্বাভাবিক অবস্থা হইতে প্রচ্যুতি ঘটে, তাঁহাকে ‘এজৎ’ বলা যায়; আত্মার কখনও তাহা হয় না, এই কারণে তাহাকে “অনেজৎ”(ন+এজৎ= অনেজৎ) বলা হইল। তিনি যেমন অনেজৎ বা নিশ্চল, তেমনি আবার মন অপেক্ষাও জবীয়ান্, অর্থাৎ সমধিক বেগবান্।

জিজ্ঞাসা হইতে পারে যে, শ্রুতি এইরূপ বিরুদ্ধ কথা বলিতেছেন কেন? যিনি নিশ্চল(অনেজৎ), তাঁহারই আবার বেগশালিতা কিরূপে সম্ভব হয়? নিশ্চলের বেগোক্তি সর্বথাই বিরুদ্ধ কথা। না,- এইরূপ দোষ এখানে হয় না; কারণ ব্রহ্মের নিরুপাধিক ও সোপাধিক ভাবে উক্ত উভয় কথারই সামঞ্জস্য হইতে পারে। ব্রহ্মের দুইটি অবস্থা,-একটি সোপাধিক, অপরটি নিরুপাধিক। তন্মধ্যে, স্বচ্ছস্বভাব, অন্তঃকরণরূপী মনে সহজেই ব্রহ্মের প্রতিবিম্বন বা অভিব্যক্তি হইয়া থাকে; এজন্য মনকে ব্রহ্মের উপাধি বলা হয়, এবং মনের ধর্ম্ম সুখ, দুঃখাদিরও তাহাতে আরোপ করা হয়। এই মনঃ-সমন্বিত আত্মা সোপাধিক; আর ব্রহ্মের সত্য, জ্ঞান ও আনন্দ স্বরূপটি নিরুপাধিক। তন্মধ্যে নিরুপাধিকরূপে বা স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি অনেজৎ, আর সোপাধিক অবস্থায় মন অপেক্ষাও দ্রুতগামী।

এ কথার অভিপ্রায় এই যে, অন্তঃকরণরূপী মনের সংকল্প-বিকল্প একটি স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম। ‘ইহা ভাল, ইহা ভাল নহে’ ইত্যাদি প্রকার চিন্তাকে ‘সংকল্প বিকল্প’ বলে। মন স্বীয় সংকল্প-বলে বা ইচ্ছামাত্রে অতিদূরবর্তী ব্রহ্মলোক প্রভৃতি স্থানেও মুহূর্তমধ্যে যাতায়াত করিয়া থাকে; এই কারণে মনের দ্রুতগামিত্ব জগৎ-প্রসিদ্ধ। সেই মন ব্রহ্মলোকাদি যে কোন স্থানে যতই দ্রুতবেগে যাউক না কেন, যাইয়াই সেখানে আত্মচৈতন্যের অস্তিত্ব বা অভিব্যক্তি দেখিতে পায়; এই কারণে তৎকালে মনেরও মনে হয় যে, আত্মা যেন আমারও অগ্রে এই

১৬ ঈশোপনিষৎ।

স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। এই ভাবনা অনুসারেই আত্মাকে মন অপেক্ষাও ‘জবীয়ান্’(বেগশালী) বলা হইয়াছে।

দেবতাগণ স্বভাবতই প্রকাশশীল; চক্ষুঃপ্রভৃতি ইন্দ্রিয়গণও স্বাভাবিক জ্ঞান-প্রকাশে উদ্ভাসিত। সেই সাদৃশ্য থাকায় ইন্দ্রিয়গণকে এখানে ‘দেব’-শব্দে অভিহিত করিয়া বলিতেছেন যে, ইন্দ্রিয়গণও উক্ত আত্মতত্ত্ব অবগত হইতে পারে না; তাহার কারণ এই যে, সকল ইন্দ্রিয়ই স্ব স্ব কার্য্য করিতে মনের সাহায্য অপেক্ষা করে। মনঃ- সংযোগ ব্যতীত যখন কোন ইন্দ্রিয়েরই ক্রিয়া সম্পাদনে শক্তি নাই, তখন ইন্দ্রিয় অপেক্ষাও মন যে জবীয়ঃ বা অগ্রগামী, ইহা স্বীকার করিতে হইবে। সর্বাধিক অগ্রগামী মনই যখন পূর্ব্বোক্ত আত্মতত্ত্ব অনুভব করিতে পারে না, তখন তদধীন ইন্দ্রিয়গণের আর কথা কি? তাই বলিলেন যে, কোন দেবতা অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ই ইহাকে প্রাপ্ত হয় নাই।

আত্মা স্বভাবতঃ সর্বব্যাপী, সর্বপ্রকার সাংসারিক ধৰ্ম্ম—সুখ-দুঃখাদি রহিত, এবং নির্বিকার; কিন্তু, বিবেকহীন মূঢ়গণ মনে করে যে, মনের সহিত সম্বন্ধ থাকায়, তিনিই যেন ভিন্ন ভিন্ন দেহে থাকিয়া, বিবিধ বিকার ভোগ করিতেছেন। সেই আশঙ্কিত ভাব নিবারণার্থ শ্রুতি বলিয়াছেন যে, অনাত্ম বস্তু মন কিংবা ইন্দ্রিয়গণ যতই দ্রুতবেগে ধাবিত হউক না কেন, আত্মা যেন সেই সকলকেই অতিক্রম করিয়া অগ্রে গমন করে। এই গমনের অসত্যতা জ্ঞাপনার্থ স্বয়ং শ্রুতিই তাঁহাকে “তিষ্ঠৎ” বলিয়াছেন; অর্থাৎ আপাততঃ তাহাকে গতিশীল ও বিকারী বলিয়া মনে হইলেও তিনি স্বয়ং নির্বিকার ভাবেই আছেন।

সর্বদা আকাশে বিচরণ করে বলিয়া সকলের প্রাণ-ধারক, চঞ্চল- স্বভাব, বায়ুকে ‘মাতরিশ্বা’ বলা হয়,(মাতরি=অন্তরিক্ষে শ্বয়তি, গচ্ছতি, ইতি মাতরিশ্বা—বায়ুঃ)। এই মাতরিশ্বাই বিশ্ববিধাতা ‘সূত্র’

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ১৭

ইনি ‘হিরণ্যগর্ভ’ নামেও অভিহিত হন। উক্ত মাতরিশ্বা আত্মচৈতন্যের আশ্রয়ে থাকিয়া, প্রাণিগণের প্রাণ-ধারণাদি সমস্ত ক্রিয়া ও ক্রিয়াফল সম্পাদন করিতেছেন,—তিনিই অগ্নির জ্বলন ও দহন, সূর্য্যের বিশ্ব- প্রকাশন, মেঘের বারিবর্ষণ এবং অন্যান্য ভূতের অপরাপর ক্রিয়া পৃথক্ পৃথক্ ভাবে সম্পাদন করিতেছেন। ‘এই পরমেশ্বরের ভয়ে বায়ু নিয়ত প্রবাহিত হইতেছেন।’ ইত্যাদি শ্রুতিদ্বারাও কথিত বিষয় সমর্থিত বা প্রমাণিত হইতেছে। বাস্তবিকই, একমাত্র এই আত্মার সদ্ভাবেই দেহেন্দ্রিয়াদির যাহা কিছু ক্রিয়া সম্পন্ন হইয়া থাকে; নচেৎ তৎসমস্তই বিলুপ্ত হইয়া যাইত ॥৪॥

তদেজতি তন্নৈজতি তদ্দূরে তদ্বন্তিকে।

তদন্তরস্য সর্ব্বস্য তদু সর্ব্বস্যাস্য বাহ্যতঃ ॥ ১ ॥

তৎ(আত্মচৈতন্যং) এজতি(চলতি), তৎ[এব চ] ন এজতি(স্বতঃ নৈব চলতি চ), তৎ দূরে, তৎ উ অন্তিকে(সমীপে অপি)। তৎ অন্য সর্ব্বস্য (জগতঃ) অন্তঃ(অভ্যন্তরে অস্তি), তৎ উ অন্য সর্ব্বস্য(জগতঃ) বাহ্যতঃ(বহিরপি বর্ত্ততে ইতিশেষঃ) ॥

তিনি চলও বটে, নিশ্চলও বটে, তিনি অতি দূরে, অথচ অত্যন্ত নিকটে আছেন। তিনি এই সর্ব্বজগতের অন্তরে ও বাহিরে বর্তমান আছেন ॥ ৫ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

ন মন্ত্রাণাং জামিতাহস্তি ইতি পূর্ব্বমন্ত্রোক্তমপ্যর্থং পুনরাহ,-তদেজতীতি। তৎ আত্মতত্ত্বং যৎ প্রকৃতং, তদেজতি চলতি, তদেব চ নৈজতি স্বতো নৈব চলতি স্বতোহচলমেব সচ্চলতীবেত্যর্থঃ। কিঞ্চ, তৎ দূরে বর্ষকোটিশতৈরপি অবিদুষাম- প্রাপ্যত্বাৎ দূর ইব। তৎ+উ+অন্তিকে ইতি চ্ছেদঃ; তত্ত্বন্তিকে সমীপেহত্যন্তমেব বিদুষাম্ আত্মত্বাৎ, ন কেবলং দূরে-অন্তিকে চ। তদন্তরভ্যন্তরেহস্য সর্ব্বস্য। “য আত্মা সর্ব্বান্তরঃ” ইতি শ্রুতেঃ। অন্য সর্ব্বস্য জগতো নাম-রূপ-ক্রিয়াত্মকস্য, তৎ উ অপি সর্ব্বস্যাশ্য বাহ্যক্ত, ব্যাপকত্বাদাকাশবৎ নিরতিশয়সূক্ষ্মত্বাৎ অন্তঃ “প্রজ্ঞানঘন এব” ইতি চ শাসনান্নিরন্তরঞ্চ ॥ ৫ ॥

১৮ ঈশোপনিষৎ।

ভাষ্যানুবাদ:

মন্ত্রসকলের পুনরুক্তি দোষ নাই বলিয়া, এই মন্ত্রেও পূর্ব্বোক্ত মন্ত্রার্থই পুনরুক্ত হইতেছে। পূর্ব্ব মন্ত্রে কথিত হইয়াছে যে, আত্মা স্বরূপতঃ অচল—ক্রিয়াহীন, কেবল উপাধির ক্রিয়ায় তাঁহার ক্রিয়া প্রতীতি হয় মাত্র। এখানেও সেই কথা,—তিনি গমন করেন, অথচ গমন করেন না। তিনি দূরেও আছেন, এবং নিকটেও আছেন। অজ্ঞ লোকেরা কোটি কোটি জন্মেও আত্মাকে জানিতে পারে না; সুতরাং তাহাদের পক্ষে তিনি অত্যন্ত দূরবর্তী, আর জ্ঞানী পুরুষেরা তাঁহাকে স্বীয় অন্তঃকরণেই আত্মারূপে উপলব্ধি করেন; সুতরাং তাঁহাদের পক্ষে তিনি অত্যন্ত সমীপবর্তী; কারণ, আত্মা অপেক্ষা আর কেহই অত্যন্ত নিকটবর্তী হইতে পারে না। অতএব, তিনি যে, কেবলই দূরে আছেন, তাহা নহে, তিনি অত্যন্ত নিকটেও আছেন। তিনি নাম, রূপ ও ক্রিয়াপূর্ণ এই সমস্ত জগতের অভ্যন্তরে বিরাজ করিতেছেন; ‘যিনি সর্ব্ব বস্তুর অভ্যন্তরস্থিত আত্মা’; এই শ্রুতিও কথিত বিষয়ে প্রমাণ। তিনি আকাশের ন্যায় ব্যাপক ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম; এই কারণে তিনি বাহিরেও সর্ব্ব বস্তুকে ব্যাপিয়া রহিয়াছেন। শ্রুতি তাঁহাকে ‘নিরবচ্ছিন্ন(অর্থাৎ অবকাশবিহীন) জ্ঞানঘন, একরস বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন; সুতরাং জগতে সর্বত্র সর্ব্বতোভাবে তাঁহার সম্বন্ধ রহিয়াছে; কুত্রাপি সেই সম্বন্ধের অভাব নাই, বুঝিতে হইবে॥ ৫॥

যস্তু সর্ব্বাণি ভূতানি আত্মন্যেবানুপশ্যতি।

সর্ব্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে ॥ ৬ ॥

যঃ তু সর্ব্বাণি ভূতানি আত্মনি এব অনুপশ্যতি, সর্ব্বভূতেষু চ আত্মানম্ অনুপশ্যতি,[সঃ] ততঃ(তস্মাৎ এব দর্শনাৎ—ভেদ-মোহাভাবাৎ) ন বিজুগুপ্সতে (জুগুপ্সাং—ঘৃণাং ন করোতি)॥

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতাঃ। ১১

যিনি সর্ব্বদা সর্ব্বভূতকে আত্মাতে এবং আত্মাকেও সর্ব্বভূতে দর্শন করেন, তিনি সেই সর্ব্বাত্মভাব-দর্শনের ফলে(কাহাকেও) ঘৃণা করেন না ॥৬৷৷

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

যস্তিতি। যঃ পরিব্রাড্ মুমুক্ষুঃ সর্ব্বাণি ভূতানি অব্যক্তাদীনি স্থাবরাস্তানি আত্মন্যেবানুপশ্যতি-আত্মব্যতিরিক্তানি ন পশ্যতীত্যর্থঃ। সর্ব্বভূতেষু চ তেষেব চাত্মানং-তেষামপি ভূতানাং স্বমাত্মানম্ আত্মত্বেন, যথাস্য দেহস্য কার্য্য-কারণ- সঙ্ঘাতস্য আত্মাহহং সর্ব্বপ্রত্যয়-সাক্ষিভূতশ্চেতয়িতা কেবলো নির্গুণঃ; অনেনৈব স্বরূপেণ অব্যক্তাদীনাং স্থাবরান্তানাম্ অহমেবাত্মেতি সর্ব্বভূতেষু চাত্মানং নির্বিশেষং যস্ত অনুপশ্যতি, স ততস্তস্মাদেব দর্শনাৎ ন বিজুগুপ্সতে-বিজুগুপ্সাং ঘৃণাং ন করোতি’ প্রাপ্তস্যৈবানুবাদোহয়ম্। সর্ব্বা হি ঘৃণা আত্মনোইন্যৎ দুষ্টং পশ্যতো ভবতি। আত্মানমেবাত্যন্তবিশুদ্ধং নিরন্তরং পশ্যতোঃন ঘৃণানিমিত্তমর্থান্তরমস্তীতি প্রাপ্তমেব,-ততো ন বিজুগুপ্সত ইতি ॥ ৬॥

ভাষ্যানুবাদ।

যিনি মুক্তিলাভের ইচ্ছায় প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং অব্যক্ত প্রকৃতি হইতে স্থাবর—তৃণ লতা পর্য্যন্ত সমস্ত বস্তুকে আত্মায় অবস্থিত দেখেন, কিছুই আত্মার বাহিরে কিংবা আত্মা হইতে পৃথক্ দেখেন না,—সেইরূপ আপনাকেও সর্বভূতে অবস্থিত দেখেন, অর্থাৎ জ্ঞান-সাক্ষী, বোদ্ধা আমি যেরূপ ইন্দ্রিয়াদির সমষ্টিরূপ এই দেহের আত্মা, সেইরূপ অব্যক্তাদি স্থাবর পর্য্যন্ত সর্বভূতেরও আমিই আত্মা; যিনি এইরূপে সর্বভূতে নির্বিশেষ আত্মভাব দর্শন করেন, তিনি তাহার ফলে কাহাকেও ঘৃণা করেন না, বা করিতে পারেন না।

সর্বাত্মদর্শী ব্যক্তি যে, কাহাকেও ঘৃণা করেন না, ইহা কোনও বিধি বা আদেশ-বাক্যের ফল নহে; ইহা তাঁহার সেই অবস্থার স্বাভাবিক ধৰ্ম্ম, এই শ্রুতি সেই স্বাভাবিক অবস্থারই অনুবাদ বা উল্লেখ করিয়াছেন মাত্র। তাৎপর্য্য এই যে, সাধারণতঃ অপর বস্তুর(আত্ম- ভিন্ন বস্তুর) কোনরূপ দোষ দেখিলেই ঘৃণা জন্মে; কিন্তু যিনি

২০ ঈশোপনিষৎ।

সর্বত্র নিত্য নির্ম্মল, বিশুদ্ধ আত্মার সদ্ভাব সন্দর্শন করেন, আত্মাহইতে পৃথক্ কোন বস্তুই দর্শন করেন না, তাঁহার পক্ষে এমন কি পদার্থ আছে, যাহার দর্শনে ঘৃণা হইতে পারে? কাজেই উক্ত বাক্যটিকে স্বতঃসিদ্ধ কথার উল্লেখরূপ-অনুবাদ ভিন্ন বিধি-বাক্য বলা যাইতে পারে না ॥ ৬ ॥

যস্মিন্ সর্ব্বাণি ভূতানি আদ্যৈবাভূদ্ বিজানতঃ।

তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ ॥ ৭॥

যস্মিন্(কালে, পূর্ব্বোক্তাত্মনি বা) সর্ব্বাণি ভূতানি আত্মা এব অভূৎ (পরমার্থাত্ম-বস্তুদর্শনাৎ আত্মা সম্পন্নো ভবতি)। বিজানতঃ(পরমার্থতত্ত্বম্ অনুভবিতুঃ) একত্বম্(সর্ব্বত্র আত্মৈকত্বং চ) অনুপশ্যতঃ(জনস্য) তত্র(তস্মিন্ কালে আত্মনি বা) কঃ মোহঃ, কঃ শোকঃ[চ]।[অত্র অবিদ্যা-জন্যয়োঃ শোক-মোহয়োর- সম্ভব-প্রদর্শনেন সংসার নিবৃত্তিরপি সূচিতা ভবতীত্যাশয়ঃ]।

যে সময় সর্ব্বভূতই আত্মার সঙ্গে এক ও অভিন্ন হইয়া যায়, তখন সেই একত্বদর্শী জ্ঞানীর শোকই বা কি? আর মোহই বা কি? শোক, মোহ, থাকে না। শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

ইমমেবার্থমন্যোহপি মন্ত্র আহ;—যস্মিন্ সর্ব্বাণি ভূতানি। যস্মিন্ কালে যথোক্তা- ত্মনি বা, তান্যের ভূতানি সর্ব্বাণি পরমার্থাত্মদর্শনাদ্ আত্মৈবাহভূৎ আত্মৈব সংবৃত্তঃ, পরমার্থবস্তু-বিজানতস্তত্র তস্মিন্ কালে তত্রাত্মনিবা কোমোহঃ, কঃ শোকঃ? শোকশ্চ মোহশ্চ কাম-কর্মবীজমজানতো ভবতি; ন তু আত্মৈকত্বং বিশুদ্ধং গগনোপমং পশ্যতঃ। কো মোহঃ কঃ শোক ইতি শোক-মোহয়োরবিদ্যা-কার্য্যয়োঃ আক্ষেপেণ অসম্ভবপ্রদর্শনাং সকারণস্য সংসারস্য অন্তমেবোচ্ছেদঃ প্রদর্শিতো ভবতীতি ॥৭॥

ভাষ্যানুবাদ।

অপর মন্ত্রও পূর্ব্বোক্ত অর্থই নির্দেশ করিতেছেন। এই মন্ত্র বলিতে- ছেন যে, কথিত আত্মতত্ত্ব-দর্শনের ফলে যে সময় বা যে আত্মাতে পূর্ব্বোক্ত ভূতনিচয় নিশ্চয়ই আত্মস্বরূপ সম্পন্ন হইয়া যায়; সেই আত্ম- তত্ত্বজ্ঞ এবং সর্বত্র আত্মৈকত্বদর্শীর নিকট সেই সময় কিংবা সেই আত্মাতে শোকই বা কি? মোহই বা কি? শোক মোহ কিছুই থাকে না।

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ২১

সর্বত্র ভেদ-দর্শন বা আত্মজ্ঞানের অভাবই যে, বিভিন্ন বিষয়ে কামনা ও তদনুরূপ কৰ্ম্ম বা চেষ্টা উৎপাদন করে, ইহা যাহারা জানে না, তাহারাই প্রিয়-বিয়োগে ও অপ্রিয়-সংযোগে শোক-মোহ অনুভব করিয়া থাকে; কিন্তু যাঁহারা গগনের ন্যায় নির্লেপ ও বিশুদ্ধ আত্মার যথার্থ স্বরূপ সন্দর্শন করিয়া, সর্বত্র আত্ম-সম্ভাব উপলব্ধি করিয়াছেন, তাঁহাদের পক্ষে কখনই শোক মোহ-সম্ভবপর হইতে পারে না। এস্থলে আত্মৈকত্বদর্শীর শোক-মোহের অসম্ভাবনা প্রদর্শন হইতে ইহাও বুঝিতে হইবে যে, তদবস্থায় সংসার ও সংসার কারণ অবিদ্যাও থাকে না,—উহা সমূলে বিনষ্ট হইয়া যায় ॥ ৭ ॥

স পর্য্যগাচ্ছু ক্রমকায়মব্রণ- মস্নাবিরঙ্ শুদ্ধমপাপবিদ্ধম্। কবির্মনীষী পরিভূঃ স্বয়ম্ভূ- র্যাখাতথ্যতোহর্থান্ ব্যদধাৎ

শাশ্বতীভ্যঃ সমাভ্যঃ ॥ ৮ ॥

শুক্রং(শুক্রঃ-শুদ্ধঃ দীপ্তিমানিতি যাবৎ), অকায়ম্(অকায়ঃ-সূক্ষ্মশরীর- শূন্যঃ), অব্রণম্(অব্রণঃ-অক্ষতঃ), অস্নাবিরম্ অস্নাবিরঃ-(শিরারহিতঃ। ব্রণ শিরোপলক্ষিত-স্থূলশরীররহিতঃ) শুদ্ধং(শুদ্ধঃ-নিৰ্ম্মলঃ), অপাপবিদ্ধং(অপাপবিদ্ধঃ- ধর্মাধৰ্ম্মবর্জিতঃ), কবিঃ(সর্ব্বদৃক্-ভূত-ভবিষ্যদ্বর্ত্তমানদর্শীত্যর্থঃ), মনীষী(মনসঃ- প্রভুঃ-সর্বজ্ঞঃ), পরিভূঃ(সর্ব্বোপরি বিরাজমানঃ), স্বয়ম্ভুঃ(নির্হেতুকঃ) সঃ (পরমাত্মা) পর্য্যগাৎ(পরি-সমন্তাৎ গতবান্)[সচ] যাথাতথ্যতঃ(যথাযথহেতু- ফলরূপেণ) শাশ্বতীভ্যঃ(নিত্যাভ্যঃ) সমাভ্যঃ(সংবৎসরাখ্যেভ্যঃ প্রজাপতিভ্যঃ) অর্থান্(কর্তব্যপদার্থান্)(ব্যদধাৎ বিভজ্যদত্তবানিত্যর্থঃ)।

সূক্ষ্ম ও স্থূলশরীর শূন্য, শুদ্ধ, নিষ্পাপ, জ্যোতির্ময়, সর্ব্বদর্শী, মনীষী, সর্ব্বোপরি বর্তমান ও স্বয়ং প্রকাশ সেই পরমাত্মা সমস্ত বস্তু ব্যাপিয়া রহিয়াছেন, এবং সংবৎ- সরাধিপতি চিরন্তন প্রজাপতিগণকে কর্তব্য বিষয়সমূহ যথাযথরূপে প্রদান করিয়াছেন।।

২২’ ঈশোপনিষৎ।

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

যোহয়মতীতৈৰ্ম্মন্ত্রৈরুক্ত আত্মা, স স্বেন রূপেণ কিং লক্ষণ ইত্যাহ অয়ং মন্ত্রঃ। স পর্য্যগাৎ, স যথোক্ত আত্মা পর্য্যগাৎ-পরি সমন্তাৎ অগাৎ গতবান্ আকাশবদ্ব্যাপী- ত্যর্থঃ। শুক্রং শুদ্ধং জ্যোতিষ্মৎ দীপ্তিমানিত্যর্থঃ। অকায়মশরীর:-লিঙ্গশরীর- বর্জিত ইত্যর্থঃ। অব্রণমক্ষতম্। অস্নাবিরং-স্নাবাঃ শিরা যস্মিন্ ন বিদ্যন্ত ইত্য- স্নাবিরম্। অব্রণমস্নাবিরমিত্যাভ্যাং স্থূলশরীর-প্রতিষেধঃ। শুদ্ধং নিৰ্ম্মলমবিদ্যামল- রহিতমিতি কারণশরীরপ্রতিষেধঃ। অপাপবিদ্ধং ধৰ্মাধর্মাদি-পাপবর্জিতম্। শুক্রমিত্যাদীনি বচাংসি পুংলিঙ্গত্বেন পরিণেয়ানি। “স পর্য্যগাৎ” ইত্যুপক্রম্য “কবিৰ্ম্মনীষীইত্যাদিনা পুংলিঙ্গত্বেনোপসংহারাৎ। কবিঃ ক্রান্তদর্শী-সর্ব্বদৃক্। “নান্যোহতোহস্তি দ্রষ্টা” ইত্যাদিশ্রুতেঃ। মনীষী মনস ঈষিতা-সর্বজ্ঞ ঈশ্বর ইত্যর্থঃ। পরিভূঃ সর্বেষাং পরি-উপরি ভবতীতি পরিভূঃ। স্বয়ম্ভূঃস্বয়মেব ভবতীতি, যেযামুপরি ভবতি, যশ্চোপরি ভবতি, সঃ সর্ব্বঃ স্বয়মেব ভবতীতি স্বয়ম্ভুঃ। স নিত্যমুক্তঈশ্বরো যাথাতথ্যতঃ, সর্বজ্ঞত্বাদ যথাতথাভাবো যাথাতথ্যং তস্মাদ যথাভূত- কৰ্ম্মফলসাধনতোহর্থান্ কর্তব্যপদার্থান্ ব্যদধাদিহিতবান্-যথানুরূপং ব্যভজদিত্যর্থঃ। শাশ্বতীভ্যো নিত্যাভঃ সমাভ্যঃ সংবৎসরাখ্যেভ্যঃ প্রজাপতিভ্য ইত্যর্থঃ ॥ ৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

পূর্ববর্তী মন্ত্রসমূহে যে আত্মা বর্ণিত হইয়াছে, তাহার প্রকৃত স্বরূপটি কিরূপ, তাহাই এই মন্ত্রে বর্ণিত হইতেছে,—

সেই আত্মা, শুক্র-বিশুদ্ধ, জ্যোতির্ময়; অকায়-সূক্ষম-শরীর- রহিত, অব্রণ ও অম্লাবির, অর্থাৎ ক্ষত ও শিরাশূন্য; সুতরাং স্থূল- শরীর রহিত; আর তিনি, শুদ্ধ-নিৰ্ম্মল, অপাপবিদ্ধ-পাপ-পুণ্য- সম্বন্ধ-বর্জ্জিত, অর্থাৎ নিত্য নির্দোষ; কবি-ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান- দর্শী; মনীষী-মনেরও প্রভু-স্বায়ত্ত-চিত্ত; এবং পরিভূ-সর্বোপরি বিরাজমান। তিনি আকাশের ন্যায় সর্বজগৎ ব্যাপিয়া রহিয়াছেন এবং তিনিই চিরন্তন সমা অর্থাৎ সংবৎসরাধিপতি প্রজাপতিগণকে সমুচিত কৰ্ম্মফল ও তৎসাধনীভূত কর্তব্যসমূহ বিভক্ত করিয়া দিয়াছেন ॥৮॥

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ২৩

অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেহবিদ্যামুপাসতে। ততো ভূয় ইব তে তমো য উ বিদ্যায়াৎ রতাঃ ॥৯৷৷

যে অবিদ্যাং(জ্ঞানরহিতং কেবলং কৰ্ম্ম) উপাসতে(অনুতিষ্ঠন্তি), তে অন্ধম্ তমঃ(আত্মজ্ঞানা-ভাবাৎ অদর্শনাত্মকম্ অহং মমাদ্যভিমানং) প্রবিশন্তি। যে উ (পুনঃ), বিদ্যায়াং(কর্মানুষ্ঠানং পরিত্যজ্য কেবলং দেবতোপাসনে) রতাঃ, তে[অপি আত্মভাবাৎ] ততঃ(তস্মাং পূর্ব্বোক্তাৎ তমসঃ) ভূয়ঃ(বহুতরম্) ইব(এব) তমঃ(অদর্শনাত্মকং প্রবিশন্তীতিশেষঃ) ॥

যাহারা অবিদ্যার উপাসনা করে, তাহারা অন্ধতমে(অজ্ঞানান্ধকারে) প্রবেশ করে। আর যাহারা কেবল দেবতা-চিন্তায় নিরত থাকে, তাহারা তদপেক্ষাও অধিক অন্ধতমে প্রবেশ করে ॥ ৯ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

‘অত্রাদ্যেন মন্ত্রেণ সর্ব্বৈষণাপরিত্যাগেন জ্ঞাননিষ্ঠোক্তা-প্রথমো বেদার্থঃ; “ঈশা বাস্যমিদং সর্ব্বং, মাগৃধঃ কস্যস্বিং ধনম্” ইতি অজ্ঞানাং জিজীবিষুণাং জ্ঞাননিষ্ঠাহস- ম্ভবে “কুর্ব্বন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিযেৎ” ইতি কৰ্ম্মনিষ্ঠোক্তা-দ্বিতীয়ো বেদার্থ। অনয়োশ্চ নিষ্ঠয়োর্বিভাগো মন্ত্রপ্রদর্শিতয়োর হদারণ্যকেহপি প্রদর্শিতঃ,- “সোহকাময়ত-জায়া মে স্যাৎ” ইত্যাদিনা। অজ্ঞস্য কামিনঃ কর্মাণীতি। “মন এবাস্যাত্মা, বাগ্‌জায়া” ইত্যাদিবচনাৎ অজ্ঞত্বং কামিত্বং চ কৰ্ম্মনিষ্ঠস্য নিশ্চিতমব- গম্যতে। তথাচ, তৎফলং সপ্তান্নসর্গস্তেঘাত্মভাবেনাত্মস্বরূপাবস্থানং, জায়াদ্যেষণা- ত্রয়সন্ন্যাসেন চাত্মবিদাং কৰ্ম্মনিষ্ঠাপ্রাতিকূল্যেন আত্মস্বরূপনিষ্ঠেব দর্শিতা,-- “কিং প্রজয়া করিষ্যামো যেষাং নোহয়মাত্মাহয়ং লোকে” ইত্যাদিনা। যে তু জ্ঞাননিষ্ঠাঃ সন্ন্যাসিনঃ তেভ্যঃ “অসূর্য্যা নাম তে”, ইত্যাদিনা অবিদ্বন্নিন্দাদ্বারেণ আত্মনোযাথাত্ম্যং স পর্যগাদ” ইত্যেতদন্তৈর্মন্ত্রৈরুপদিষ্টম্; তে হ্যত্রাধিকৃতা ন কামিন ইতি। তথা চ শ্বেতাশ্বতরাণাং মন্ত্রোপনিষদি-“অত্যাশ্রমিভ্যঃ পরমং পবিত্রং প্রোবাচ সম্যগৃষি- সঙ্ঘজুষ্টম্” ইত্যাদি বিভজ্যোক্তম্। যে তু কর্মিণঃ কৰ্ম্মনিষ্ঠাঃ কৰ্ম্ম কুর্ব্বন্ত এব জিজীবিষবস্তেভ্য ইদমুচ্যতে;-অন্ধং তম ইত্যাদি। কথং পুনরেবমবগম্যতে, ন তু সর্ব্বেষামিতি? উচ্যতে-অকামিনঃ সাধ্য-সাধনভেদোপমর্দ্দেন, “যস্মিন্ সর্ব্বাণি ভূতান্যায়ৈবাঁভূদ্বিজানতঃ। তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনুপশ্যতঃ”

২৪ ঈশোপনিষৎ।

ইতি যদ্ আত্মৈকত্ববিজ্ঞানং, তন্ন কেনচিৎ কৰ্ম্মণা জ্ঞানান্তরেণ বা হ্যমূঢ়ঃ সমুচ্চিচীষতি। ইহ তু সমুচ্চিচীষয়াহবিদ্বদাদিনিন্দা ক্রিয়তে। তত্র চ যস্য যেন সমুচ্চয়ঃ সম্ভবতি ন্যায়তঃ শাস্ত্রতো বা, তদিহোচ্যতে। যৎ দৈবং বিত্তং দেবতাবিষয়ং জ্ঞানং কৰ্ম্মসম্বন্ধিত্বেন উপন্যস্তং, ন পরমাত্মজ্ঞানম্, “বিদ্যয়া দেবলোকঃ” ইতি পৃথক্ ফলশ্রবণাৎ তয়োজ্ঞানকর্মণোরিহ একৈকানুষ্ঠাননিন্দা সমুচ্চিচীষয়া, ন নিন্দা- পরৈব, একৈকস্য পৃথফ্লশ্রবণাৎ। “বিদ্যয়া তদারোহন্তি,” “বিদ্যয়া দেবলোকঃ,” “ন তত্র দক্ষিণা যন্তি,” “কর্মণা পিতৃলোকঃ” ইতি। নহি শাস্ত্রবিহিতং কিঞ্চিদ- কর্তব্যতামিয়াৎ। তত্র অন্ধংতমঃ অদর্শনাত্মকং তমঃ প্রবিশন্তি। কে? যে অবিদ্যাং- বিদ্যায়া অন্য। অবিদ্যা, তাং কর্মেত্যর্থঃ; কর্মণো বিদ্যাবিরোধিত্বাৎ। তামবিদ্যা- মগ্নিহোত্রাদিলক্ষণামেব কেবলামুপাসতে,-তৎপরাঃ সন্তোহনুতিষ্ঠন্তীত্যভিপ্রায়ঃ। ততস্তস্মাদন্ধাত্মকাৎ তমসো ভূয় ইব বহুতরমেব তে তমঃ প্রবিশন্তি। কে? কৰ্ম্ম হিত্বা যে উ যে তু বিদ্যায়ামের দেবতাজ্ঞান এব রতাঃ অভিরতাঃ। তত্র অবান্তরফল- ভেদং বিদ্যাকৰ্ম্মণোঃ সমুচ্চয়কারণমাহ। অন্যথা ফলবদফলবতোঃ সন্নিহিতয়োঃ অঙ্গাঙ্গিতৈব স্যাদিত্যর্থঃ ॥ ৯ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

প্রথম মন্ত্রে পুত্র, বিত্ত ও স্বর্গাদি লোক লাভের বাসনা পরিত্যাগ- পূর্ব্বক জ্ঞান-নিষ্ঠা গ্রহণের উপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে এবং দ্বিতীয় মন্ত্রে আত্মজ্ঞানে অক্ষম, জীবনেচ্ছু ব্যক্তির পক্ষে কর্মনিষ্ঠা অবলম্বনের আদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। বৃহদারণ্যকোপনিষদেও জ্ঞাননিষ্ঠা ও কর্মনিষ্ঠার এইরূপই বিভাগ প্রদর্শিত হইয়াছে। সেখানে আছে,- “প্রথমজাত পুরুষ হিরণ্যগর্ভ কামনা করিলেন,-যে, ‘আমার একটি জায়া(পত্নী) হউক,’ ইত্যাদি। সেই বাক্যে আত্মজ্ঞানবিহীন, কামনাবান্ পুরুষের জন্য কর্মানুষ্ঠান নির্দিষ্ট হইয়াছে। তৎপরবর্তী ‘মনই ইহার আত্মা, বাক্যই ইহার পত্নী’, ইত্যাদি বাক্য হইতে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, আত্মজ্ঞানের অভাব ও ভোগ-বিষয়ে অভিলাষই কর্মনিষ্ঠার মূল কারণ; আর সপ্তপ্রকার অন্নের(ভোগ্য পদার্থের)

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ২৫

সৃষ্টি এবং তাহাতেই যে, ‘আমি, আমার’ ইত্যাদিরূপ মমতা স্থাপন, তাহাই সংসার এবং কর্মনিষ্ঠার ফল। পক্ষান্তরে, যাঁহারা আত্মবিৎ, তাঁহাদের পক্ষে ‘আমরা সেই সন্তান দ্বারা কি করিব, যাহা দ্বারা এই আত্মাকে লাভ করা যায় না’, ইত্যাদি বাক্যে পুত্রাদি কামনা ও ‘আমি, আমার’ প্রভৃতি অভিমান পরিত্যাগ পূর্বক, কৰ্ম্ম-নিষ্ঠার বিপরীত জ্ঞান-নিষ্ঠাই প্রতিপাদিত হইয়াছে।

বস্তুতই যাঁহারা আত্মনিষ্ঠজ্ঞানী, কেবল তাঁহাদেরই জন্য ‘স পর্য্যগাৎ’ এই মন্ত্রপর্যন্ত সমস্ত বাক্যে আত্মার যথাযথ স্বরূপ বর্ণিত হইয়াছে; এবং ইঁহাদের স্তুতির জন্যই “অসুর্যা নাম তে লোকাঃ,” ইত্যাদি মন্ত্রে আত্মজ্ঞান-বিহীন পুরুষের নিন্দা প্রদর্শিত হইয়াছে। অতএব, জ্ঞাননিষ্ঠ পুরুষেরাই এই আত্মতত্ত্বজ্ঞানে অধিকারী, কামনাবান্(সকাম) পুরুষেরা নহে। শ্বেতাশ্বতরীয় মন্ত্রোপনিষদে কথিত আছে যে, ‘অত্যাশ্রমী সন্ন্যাসিগণের উদ্দেশে ঋষিগণ-সেবিত পরমপবিত্র আত্মতত্ত্ব সম্যরূপে উপদেশ করিয়াছিলেন।’ সেখানে ‘অত্যাশ্রমী’ শব্দে জ্ঞাননিষ্ঠ সন্ন্যাসিগণ বুঝিতে হইবে এবং তাঁহাদের জন্যই বিশেষভাবে আত্মতত্ত্বোপদেশ নিদ্দিষ্ট হইয়াছে। আর যাহারা কর্মনিষ্ঠ— যাবজ্জীবন কৰ্ম্ম করিতে ইচ্ছা করে, তাহাদের জন্যই এই “অন্ধং তমঃ” মন্ত্র আরব্ধ হইয়াছে, বুঝিতে হইবে।

ভাল, এই মন্ত্র যে, কেবল সকাম ব্যক্তির পক্ষেই প্রযুক্ত হইয়াছে,—অন্য কাহারো পক্ষে প্রযুক্ত হয় নাই, ইহা বুঝা যায় কিসে? এ আপত্তির উত্তর এই,—অতীত সপ্তম মন্ত্রে সাধ্য—ফল ও তৎসাধনাদিবিষয়ে ভেদবুদ্ধি পরিত্যাগের উপদেশ আছে; সুতরাং তাহার সহিত যে কোন কর্ম্মের কিংবা দৈবত- চিন্তার সমুচ্চয় বা সহানুষ্ঠান হইতেই পারে না, একথা কোন বুদ্ধিমান্ পুরুষই অস্বীকার করিতে পারেন না। শাস্ত্র ও ন্যায়ানুসারে

২৬ ঈশোপনিষৎ।

যেরূপ কর্ম্মের সহিত যেরূপ বিদ্যার(দেবতাজ্ঞানের) সমুচ্চয় বা একত্র অনুষ্ঠান হইতে পারে, তাদৃশ কৰ্ম্ম ও জ্ঞানের(দেবতাজ্ঞানের) সমুচ্চয়ে অনুষ্ঠান করা একান্ত কর্তব্য, এই অবশ্যকর্তব্যতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে কেবলই কর্মে কিংবা কেবলই জ্ঞানে রত অজ্ঞ পুরুষদিগের নিন্দা করা হইয়াছে।[অভিপ্রায় এই যে] যে সকল দৈববিত্ত(দেবতার উপাসনা) কর্ম্মের সহিত অনুষ্ঠেয় বলিয়া বিহিত আছে, সেই সকল জ্ঞান কখনই পরমাত্ম-জ্ঞান হইতে পারে না; কারণ, এই সকল বিদ্যা বা জ্ঞানের ফল হইতেছে—দেবলোক-প্রাপ্তি, আর পরমাত্ম- জ্ঞানের ফল হইতেছে—মোক্ষ-প্রাপ্তি; সুতরাং এইরূপ ফলের পার্থক্য হইতেই তৎসাধনীভূত উভয় প্রকার জ্ঞানের-পার্থক্য বা ভেদ সহজেই অনুমিত হয়। অতএব, দেবতাজ্ঞান(দেবতার উপাসনা) ও কৰ্ম্মা- নুষ্ঠানের একত্র সম্ভব থাকায় কৰ্ম্ম ও কেবল দেবতারাধনা, একটি- মাত্রের অনুষ্ঠানে নিন্দা করা হইয়াছে, বস্তুতঃ কৰ্ম্ম বা দেবতোপাসনার নিন্দা করা হয় নাই। তাহা হইলে ‘বিদ্যা দ্বারা দেবলোক-লাভ হয়।’ ‘বিদ্যা দ্বারা সেই স্থানে গমন করে।’ ‘কর্মীরা সেই স্থানে যাইতে পারে না‘। ‘কৰ্ম্ম দ্বারা পিতৃলোক-লাভ হয়’—ইত্যাদি রূপে জ্ঞান ও কর্মের পৃথক্ পৃথক্ ফলের উল্লেখ থাকিত না। বস্তুতঃ শাস্ত্র-বিহিত কৰ্ম্ম কখনই অকর্তব্য বা অনুষ্ঠানের অযোগ্য হইতে পারে না।

এই মন্ত্রটির সম্মিলিত অর্থ এইরূপ,—যাহারা অবিদ্যার উপাসনা করে, তাহারা অন্ধ তমে প্রবেশ করে, অর্থাৎ ‘আমি, আমার’ ইত্যাদি অভিমানাত্মক অজ্ঞানে মুগ্ধ হয়। ‘অবিদ্যা’ অর্থ—আত্মজ্ঞানের প্রতিকূল—অগ্নিহোত্রাদি কর্ম্ম; যাহারা কেবলই কর্ম্মতৎপর, তাহারা অন্ধ তমে প্রবেশ করে; আর যাহারা কর্ম্মানুষ্ঠান ত্যাগ করিয়া, কেবলই বিদ্যায়(দেবতা-চিন্তায়) নিরত থাকে, তাহারা পূর্ব্বাপেক্ষাও অধিকতর অন্ধ তমে প্রবেশ করে।

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ২৭

বিদ্যা ও কর্ম্মের পৃথক্ পৃথক্ অনুষ্ঠানে যে দুইটি ফলের উল্লেখ হইল, এই দুইটি ফলই অবান্তর(অপ্রধান) ফল মাত্র, উহাদের এতদ্ভিন্ন আরও ফল আছে। পৃথক্ ফলের উল্লেখ না থাকিলে, সহজেই মনে হইত যে, উভয়ের মধ্যে যাহার ফলোল্লেখ নাই, সেইটি বোধ হয় অপরটির অঙ্গ বা অধীন—স্বতন্ত্র নহে। পৃথক্ পৃথক্ ফলোল্লেখদ্বারা সেই শঙ্কার পরিহার করা হইল ॥ ৯ ॥

অন্যদেবাহুবিদ্যয়াহন্যদাহুরবিদ্যয়া।

ইতি শুক্রম ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে ॥ ১০ ॥

বিদ্যয়া(দেবতাজ্ঞানেন) অন্যৎ(কৰ্ম্মফলাৎ পৃথক্) এব(ফলং-দেব- লোকপ্রাপ্তিরূপম্), আহুঃ(পণ্ডিতাঃ বদন্তি), অবিদ্যয়া(কর্মণা) অন্যৎ(ফলং পিতৃলোক-প্রাপ্তিরূপম্) আহুঃ। যে(আচার্য্যাঃ) নঃ(অস্মভ্যং) তৎ(কৰ্ম্ম, জ্ঞানং চ) বিচচক্ষিরে(ব্যাখ্যাতবন্তঃ, তেষাং) ধীরাণাং(ধীমতাং) ইতি(এবং- প্রকারং বচনম্) শুশ্রুম(বয়ং শ্রুতবন্তঃ) ॥

পণ্ডিতগণ বলেন যে, বিদ্যার ফল অন্য, এবং অবিদ্যারও ফল অন্য। যাহারা আমাদের নিকট ঐ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়াছেন, সেই সুধীগণের নিকট ইহা শ্রবণ করিয়াছি ॥ ১০ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

অন্যদেবেত্যাদি। অন্যৎ পৃথগেব বিদ্যয়া ক্রিয়তে ফলমিত্যাহুবদন্তি, “বিদ্যয়া দেবলোকঃ,” “বিদ্যয়া তদারোহন্তি,” ইতিশ্রুতেঃ। অন্যদাহুরবিদ্যয়া কৰ্ম্মণা ক্রিয়তে, “কর্মণা পিতৃলোকঃ,” ইতি শ্রুতেঃ। ইত্যেবং শুশ্রুম শ্রুতবন্তো বয়ং ধীরাণাং ধীমতাং বচনম্; যে আচার্যা নোহস্মভ্যং তৎ কৰ্ম্ম চ জ্ঞানং চ বিচচক্ষিরে ব্যাখ্যাতবন্তঃ। তেষাময়মাগমঃ পারম্পর্য্যাগত ইত্যর্থঃ ॥ ১০ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

[ পণ্ডিতগণ] বলেন, দেবতা-চিন্তারূপ বিদ্যা দ্বারা যে ফল প্রাপ্ত- হওয়া যায়, তাহা কৰ্ম্ম-ফল হইতে পৃথক্ বা ভিন্ন—দেবলোকাদি প্রাপ্তি। ‘বিদ্যাদ্বারা দেবলোক-প্রাপ্তি হয়,’ ‘বিদ্যা দ্বারা সেই স্থানে

২৮ ঈশোপনিষৎ।

(দেবলোকাদিতে) গমন করে,’ ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারাও একথা সমর্থিত হয়। আর অবিদ্যা—অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম দ্বারা যে ফল লাভ হয়, তাহাও বিদ্যা-ফল হইতে পৃথক্—পিতৃলোকাদি-প্রাপ্তি। ‘বিদ্যাদ্বারা পিতৃ- লোক লাভ হয়,’ এই শ্রুতিই এ বিষয়ে প্রমাণ। যে সকল বেদাচার্য্য আমাদের নিকট কৰ্ম্ম ও জ্ঞানের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়াছেন, সেই সকল সুধীগণের নিকট হইতে আমরা উক্তপ্রকার উপদেশ শ্রবণ করিয়াছি ॥ ১০ ॥

বিদ্যাঞ্চাবিদ্যাঞ্চ যস্তদ্বেদোভয়ং সহ।

অবিদ্যয়া মৃত্যুং ত্যজ্যা বিদ্যয়ামৃতমশ্নুতে ॥ ১১ ॥

যঃ[পুনঃ] বিদ্যাং(দেবতাজ্ঞানং) চ অবিদ্যাং(কম্ম) চ, তৎ উভয়ং সহ (একেন পুরুষেণ অনুষ্ঠেয়ম্) বেদ(জানাতি, সঃ) অবিদ্যয়া(কৰ্ম্মণা) মৃত্যুং(মৃত্যুজনকং কাম্যকৰ্ম্মাদিকং মোক্ষলাভ-প্রতিকূলং বা) তীত্বা (অতিক্রম্য) বিদ্যয়া(দেবতাজ্ঞানেন, উপাসনয়া বা) অমৃতং(চিরজীবিত্বং, দেবতাত্মভাবমিত্যর্থঃ) অগ্নতে(প্রাপ্তোতি) ॥

যে লোক জানে যে, বিদ্যা ও অবিদ্যার একত্র অনুষ্ঠান হইতে পারে, সে অবিদ্যাদ্বারা মর্ত্যভাব অতিক্রম করিয়া, বিদ্যাদ্বারা দেবভাব লাভ করে ॥ ১১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

যত এবম্, অতঃ বিদ্যাং চ অবিদ্যাং চ দেবতাজ্ঞানং কৰ্ম্ম চেত্যর্থঃ। যস্তৎ এত- দুভয়ং সহ একেন পুরুষেণানুষ্ঠেয়ং বেদ, তস্যৈবং সমুচ্চয়কারিণ এব একপুরুষার্থসম্বন্ধঃ ক্রমেণ স্যাদিত্যুচ্যতে, —অবিদ্যয়া কৰ্ম্মণা—অগ্নিহোত্রাদিনা মৃত্যুং স্বাভাবিকং কৰ্ম্ম জ্ঞানং চ মৃত্যুশব্দবাচ্যম্, উভয়ং তীর্থা অতিক্রম্য বিদ্যয়া দেবতাজ্ঞানেন অমৃতং দেবতাত্মভাবম্ অশ্বুতে প্রাপ্নোতি। তদ্ধি অমৃতমুচ্যতে, যদ্দেবতাত্মগমনম্ ॥ ১১ ॥ ভাষ্যানুবাদ।

যেহেতু, উক্তপ্রকার বিদ্যা ও কর্ম্মের পৃথক্ অনুষ্ঠানে দোষ- শ্রুতি আছে; অতএব যে লোক জানে যে, দেবতীচিন্তা ও কর্মানুষ্ঠান একই ব্যক্তি এক সঙ্গে অনুষ্ঠান করিতে পারে; সে লোক

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ২৯

নিশ্চয়ই দেবতাচিন্তা ও বিহিত কৰ্ম্ম, উভয়েরই একত্র অনুষ্ঠান করে, এবং ক্রমে তাহাদ্বারাই আপন অভীষ্ট ফলও প্রাপ্ত হয়। প্রথমে কন্মরূপ অবিদ্যা দ্বারা মৃত্যু অতিক্রম করে, পশ্চাৎ দেবতাচিন্তারূপ বিদ্যাদ্বারা অমৃত(ক্রমমুক্তি) লাভ করে। এখানে মৃত্যু অর্থ— অবিবেকী পুরুষের অবিশুদ্ধ জ্ঞান ও কৰ্ম্ম, এবং ‘অমৃত’ অর্থ— দেবতার স্বরূপপ্রাপ্তি, কিন্তু মুক্তি নহে * ॥ ১১ ॥

অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যেহসঙ্কল্পিতমুপাসতে।

ততো ভূয় ইব তে তমো য উ সম্ভূত্যাং রতাঃ ॥ ১২ ॥

যে[ পুনঃ অগ্নিহোত্রাদীনি কৰ্ম্মাণি অনাদৃত্য] অসম্ভূতিং(কারণভূতাং প্রকৃতিমেব) উপাসতে(ভজন্তি), তে অন্ধং তমঃ(অদর্শনাত্মকম্ অজ্ঞানং) প্রবিশন্তি। যে উ(অপি’, সম্ভূত্যাং(উৎপত্তিশীলে হিরণ্যগর্ভাদৌ, তদুপাসনে ইতি ভাবঃ) রতাঃ(আসক্তাঃ). তে ততঃ ভূয়ঃ ইব(তস্মাদধিকমিব) তমঃ ( প্রবিশন্তি ইতি শেষঃ)॥.

যাহারা অসম্ভূতির(প্রকৃতির) উপাসনা করে, তাহারা অন্ধ-তমে প্রবেশ করে। আর যাহারা সম্ভূতির(হিরণগর্ভাদির) উপাসনা করে, তাহারা আরও অধিক অন্ধ তমে প্রবেশ করে ৷৷ ১২ ৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।

অধুনা। ব্যাক্ততাব্যাকৃতোপাসনয়োঃ সমুচ্চিচীষয়া প্রত্যেকং নিন্দোচ্যতে। অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি যে অসম্ভূতিং, সম্ভবনং সম্ভূতিঃ, সা যস্য কার্য্যস্য, সা সম্ভূতিঃ,

* আত্ম-জ্ঞানবিমুখ অবিবেকী লোক যতই দেবতোপাসনা ও কর্মানুষ্ঠান করুক না কেন, আত্মতত্ত্ব-জ্ঞান ব্যতীত কিছুতেই মৃত্যুভয় অতিক্রম করিতে পারে না; এই কারণ অজ্ঞ পুরুষ- দিগের অনাত্মচিন্তা ও কর্মানুষ্ঠানকে ‘মৃত্যু’ বলা হইয়াছে।

‘অমৃত’ শব্দের দুই অর্থ-মুক্তি ও দেবত্ব। আত্মজ্ঞানীর দেহপাতেই মুক্তি হয়, তাহার আর পুনর্ব্বার মরণ হয় না; এই কারণে তাহাকে অমৃত বলে। আর দেবগণ সৃষ্টির প্রথমে উৎপন্ন হন, এবং প্রলয় কাল উপস্থিত না হওয়া পর্য্যন্ত বর্তমান থাকেন, মরেন না, এই কারণে তাঁহাদিগকেও ‘অমৃত’ বলে। পুরাণ শাস্ত্রে আছে,-“আভূতসংপ্লবং স্থানং অমৃতত্বং হি ভাষ্যতে।” অর্থাৎ প্রলয়পয্যন্ত অবস্থিতিকে ‘অমৃতত্ব’ বলে। এই কারণই আচার্য্য এস্থলে ‘অমৃত’ শব্দে দেবভাবপ্রাপ্তি অর্থ, করিয়াছেন।

৩০ ঈশোপনিষৎ।

তস্যা অন্যা অসম্ভুতিঃ প্রকৃতিঃ—কারণমবিদ্যা অব্যাকৃতাখ্যা; তাম্ অসম্ভূতিম্ অব্যাকৃতাখ্যাং প্রকৃতিং কারণমবিদ্যাং কাম-কর্মবীজভূতাম্ অদর্শনাত্মিকাম্ উপাসতে যে তে তদনুরূপমেব অন্ধং তমোহদর্শনাত্মকং প্রবিশন্তি। ততস্তস্মাদপি ভূয়ো বহুতরমির তমঃ প্রবিশন্তি, যে উ সম্ভত্যাং কার্য্যব্রহ্মণি হিরণ্যগর্ভাখ্যে রতাঃ ॥ ১২ ॥ ভাষ্যানুবাদ।

ব্যষ্টির যেমন এক একটির পৃথক্ ভাবে বা সমুচ্চয়ে উপাসনা হইতে পারে, তেমনি সমষ্টিরও এক সঙ্গে উপাসনা হইতে পারে; তন্মধ্যে, ব্যষ্টি ও সমষ্টির একত্র(সমুচ্চয়ে) উপাসনা-বিধানার্থ তদুভয়ের পৃথক্ উপাসনার নিন্দা করিতেছেন।

যাহার উৎপত্তি আছে, তাহার নাম সম্ভূতি, আর যাহার উৎপত্তি নাই, স্বতঃসিদ্ধ অস্তিত্ব, তাহার নাম অসম্ভূতি। সুতরাং সম্ভূতির অর্থ হইতেছে,—উৎপত্তিশীল বস্তু হিরণ্যগর্ভপ্রভৃতি; আর অসম্ভূতির অর্থ হইতেছে,—জগতের মূল কারণ, অব্যাকৃত শব্দবাচ্য,(কোন নাম ও রূপে অভিব্যক্ত নহে, এমন) প্রকৃতি; জীবের সুখ-দুঃখ-ভোগের কারণীভূত কর্ম্মময় রাজ এই অব্যাকৃত প্রকৃতিতেই নিহিত থাকে।

যাহারা অনাত্মক(জড়রূপা) এই অব্যাকৃত প্রকৃতির(অসম্ভূতির) উপাসনা করে, তাহারা সেই উপাসনানুসারে অন্ধ তমে অর্থাৎ অজ্ঞানান্ধকারে প্রবেশ করে; আর যাহারা সম্ভূতি অর্থাৎ প্রকৃতিসম্ভূত হিরণ্যগর্ভের উপাসনায় রত থাকে, তাহারা আরও অধিকতর অন্ধ তমে প্রবেশ করে * ॥ ১২ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৩১

অন্যদেবাহুঃ সম্ভবাদন্যদাহুরসম্ভবাৎ। ইতি শুশ্রুম ধীরাণাং যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে॥ ১৩॥

সম্ভবাৎ(হিরণ্যগর্ভোপাসনাৎ) অন্যৎ(পৃথক্) এব[ফলং অণিমাদ্যৈশ্বর্য্য- লাভ-রূপম্ উৎপদ্যতে ইতি] আহুঃ(বদন্তি’[ধীরা ইতি শেষঃ]। অসম্ভবাৎ (অব্যাকৃতাৎ, তদুপাসনাদিত্যর্থঃ) অন্যৎ(পৃথক্ ফলং অন্ধতমঃ প্রাপ্তিং, প্রকৃতিলয়ং চ) আহুঃ।[কে?—] যে তৎ(ফলদ্বয়ং) নঃ(অস্মভ্যং) বিচচক্ষিরে (ব্যাখ্যাতবন্তঃ)। তেষাং] ধীরাণাং[এবং -] ইতি(বচনম্)[বয়ং] শুশ্রুম।। পণ্ডিতগণ বলেন, সম্ভৃতির ফল পৃথক্, আর অসম্ভৃতির ফল পৃথক্। যাহারা আমাদের নিকট ঐ তত্ত্বের ব্যাখ্যা করিয়াছেন, সেই সুধীগণের নিকট ইহা শ্রবণ করিয়াছি ৷৷ ১৩ ৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।

অধুনোভয়রূপোপাসনয়োঃ সমুচ্চয়-কারণম্ অবয়বফলভেদমাহ, —অন্যদেবেতি। অন্যদেব পৃথগেব আহুঃ ফলং সম্ভবাৎ সম্ভূতেঃ কার্য্যব্রহ্মোপাসনাৎ অণিমাদ্যৈশ্বর্য্য- লক্ষণং ব্যাখ্যাতবস্ত ইত্যর্থঃ। তথা চ অন্যদাহুরসম্ভবাৎ অসম্ভুতেঃ অব্যাকৃতাৎ অব্যাকৃতোপাসনাৎ, যদুক্তম—“অন্ধং তমঃ প্রবিশন্তি” ইতি, প্রকৃতিলয় ইতি চ পৌরাণিকৈরুচ্যতে, ইত্যেবং শুশ্রুম ধীরাণাং বচনম্, যে নস্তদ্বিচচক্ষিরে ব্যাকৃতা- ব্যাকৃতোপাসনফলং ব্যাখ্যাতবস্তু ইত্যর্থঃ ৷৷ ১৩ ৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

উক্ত-ব্যষ্টি ও সমষ্টির একত্র(সমুচ্চয়ে) অনুষ্ঠান করিলে, উহাদের এক একটি হইতে কি কি ফল সমুৎপন্ন হইয়া থাকে, তাহা বলিতে- ছেন,—পণ্ডিতগণ বলেন, সম্ভব—(সম্ভূতি) হিরণ্যগর্ভের উপাসনার ফল পৃথক্—অণিমাদি ঐশ্বর্য্য লাভ,(*) আর অসম্ভব অর্থাৎ

৩২ ঈশোপনিষৎ।

অব্যাকৃত প্রকৃতির উপাসনার ফলও পৃথক্ বা অন্যরূপ—অন্ধ তমে প্রবেশ। পৌরাণিকগণের মতে প্রকৃতিতে লয়প্রাপ্তিও উহার অপর একটি ফল। যে সকল সুধীগণ আমাদের নিকট এই ব্যাকৃত ও অব্যাকৃত উপাসনার ফল ব্যাখ্যা করিয়াছেন, তাঁহাদের নিকট হইতে আমরা এইরূপ উপদেশ শ্রবণ করিয়াছি ॥ ১৩ ॥

সঙ্ঘাতিক বিনাশক যস্তদ্বেদোভয়ং সহ।

বিনাশেন মৃত্যুং তীর্থং সম্ভূত্যাহমৃতমশ্নুতে ॥. ৪ ॥ বিনাশেন মৃত্যুং তত্বা। সম্ভূত্যাহমৃতমনুতে ॥.৪ ॥ যঃ সম্ভৃতিং(অত্র অকার-লোপঃ দ্রষ্টব্যঃ, ততশ্চ অসম্ভুতিং অব্যাকৃতাখ্যাং প্রকৃতিমিত্যর্থঃ।) চ, বিনাশং(ব্যাকৃত-হিরণ্যগর্ভাদিং) চ. তৎ উভয়ং সহ (একেন এব পুরুষেণ অনুষ্ঠেয়ম্) বেদ(জানাতি), সঃ বিনাশেন(হিরণ্যগর্ভাদ্যু- পাঁসনেন) মৃত্যুম্(অধৰ্ম্ম-কামাদিলক্ষণম্ অনৈশ্বর্য্যং) তীর্ত্বা(অতিক্রম্য) সম্ভূত্যা (অব্যাকৃত-প্রকৃত্যুপাসনেন) অমৃতম্(প্রকৃতিলয়ম্) অশ্বতে(প্রাপ্নোতি। যে লোক বুঝিয়াছে যে, অসম্ভুতি ও বিনাশ—হিরণ্যগর্ভের একসঙ্গে আরাধনা হইতে পারে, সে লোক বিনাশের দ্বারা মৃত্যু অতিক্রম করিয়া অসম্ভুতির দ্বারা অমৃত ভোগ করে ॥ ১৪ ॥

শাঙ্করভাষ্য।

যত এবম্, অতঃ সমচ্চয়ঃ সম্ভত্যসম্ভুত্যুপাসনয়োয্য ও এবৈকপুরুষার্থত্বাচ্চ, ইত্যাহ,-সম্ভতিং চ বিনাশং চ যস্তদ্বেদোভয়ৎ সহ। বিনাশেন-বিনাশো ধর্ম্মো যস্য কার্য্যস্য, সঃ; তেন ধম্মিণা অভেদেন উচ্যতে বিনাশ ইতি। তেন তদুপাসনেন অনৈশ্বর্য্যম্ অধৰ্ম্মকামাদিদোষজাতং চ মৃত্যুং তীর্থা, হিরণ্যগর্ভো-

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৩৩

পাসনেন হ্যণিমাদিপ্রাপ্তিঃ ফলম্, তেনানৈশ্বর্য্যাদিমৃত্যুমতীত্য অসম্ভূত্যা অব্যা- কৃতোপাসনয়া অমৃতং প্রকৃতিলয়লক্ষণমশ্নুতে। “সম্ভূতিঞ্চ বিনাশঞ্চ” ইত্যত্র অবর্ণলোপেন নির্দেশো দ্রষ্টব্যঃ, প্রকৃতিলয়ফলশ্রুত্যনুরোধাৎ ॥ ১৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

পূর্ব্বোক্ত কারণে এবং একই ব্যক্তির অনুষ্ঠানের যোগ্য বলিয়াও যে ব্যক্তি বুঝিতে পারেন যে, সম্ভূতি(অসম্ভূতি) ও বিনাশ, এই উভয়ই এক ব্যক্তির অনুষ্ঠান-যোগ; সেই ব্যক্তি প্রথমে বিনাশ (হিরণ্যগর্ভাদির) উপাসনা দ্বারা অণিমাদি ঐশ্বর্য্য লাভ করেন, পশ্চাৎ সেই ঐশ্বর্য্যদ্বারা অনৈশ্বর্য্য, অধৰ্ম্ম ও বিষয়-বাসনা প্রভৃতি দোষরূপ মৃত্যুকে অতিক্রম করেন। অনন্তর, প্রকৃতিসংজ্ঞক অসম্ভুতির উপাসনা- দ্বারা অমৃত লাভ করেন, অর্থাৎ প্রকৃতিতে বিলীন থাকেন।

‘ধৰ্ম্ম(গুণ) ও ধর্ম্মী(গুণবান্) ভিন্ন বা পৃথক্ নহে,’ এই নিয়মানুসারে বিনাশ-ধর্মযুক্ত(বিনাশী) হিরণ্যগর্ভাদিকেই এখানে ‘বিনাশ’ বলা হইয়াছে। ‘আর ছন্দের অনুরোধে ‘অসম্ভূতি’-শব্দের অকারের লোপ করিয়া ‘সম্ভূতি’ করা হইয়াছে; সুতরাং উহার অর্থ— অসম্ভূতি—প্রকৃতি। এই কারণেই উহার উপাসনায় প্রকৃতি-লয়-রূপ ফলের উল্লেখ করা হইয়াছে; সম্ভূতি-পদবাচ্য কোন জন্য-পদার্থের উপাসনায় প্রকৃতিতে লয় হইতে পারে না ॥ ১৪ ॥

হিরণ্ময়েন পাত্রেণ সত্যস্যাপিহিতং মুখম্।

তৎ, ত্বং পূষনপাণু সত্যধর্ম্মায় দৃষ্টয়ে ॥ ১৫ ॥

হিরণ্ময়েন(জ্যোতির্ময়েণ) পাত্রেণ(অপিধানভূতেন) সত্যস্য(আদিত্য- মণ্ডলস্থস্য ব্রহ্মণঃ) মুখং(প্রাপ্তিদ্বারম্) অপিহিতম্(আচ্ছাদিতম্)। পূষন্! (জগৎপোষক! পরমাত্মন্!) ত্বং সত্যধর্মায়(সত্যধর্মানুষ্ঠাত্রে মহ্যং সত্যধৰ্ম্মস্য মম ইতি বা) দৃষ্টয়ে(সত্যস্য সাক্ষাৎকারায়) তৎ(মুখম্) অপাবৃণু(অপাবৃতম্ অনাচ্ছাদিতম্—উন্মুক্তং কুরু) ॥

৩৪- ঈশোপনিষৎ।

হে পূষন্(জগৎপোষক!) জ্যোতির্ময় পাত্র(সূর্য্যমণ্ডল) দ্বারা সত্যস্বরূপ ব্রহ্মের উপলব্ধির দ্বার আবৃত হইয়া আছে, তুমি তাহা অপনীত কর; সত্যধৰ্ম্ম- পরায়ণ আমি উহা দর্শন করি ৷৷ ১৫ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

মানুষ-দৈববিত্তসাধ্যং ফলং শাস্ত্রলক্ষণং প্রকৃতিলয়ান্তম্; এতাবতী সংসারগতিঃ। অতঃপরং পূর্ব্বোক্তম্ “আত্মৈবাভূদ্বিজানতঃ” ইতি সর্বাত্মভাব এব সর্ব্বৈষণাসন্ন্যাস জ্ঞাননিষ্ঠাফলম্। এবং দ্বিপ্রকারঃ প্রবৃত্তি-নিবৃত্তিলক্ষণো বেদার্থোহত্র প্রকাশিতঃ। তত্র প্রবৃত্তিলক্ষণস্য বেদার্থস্থ্য বিধিপ্রতিষেধলক্ষণস্থ্য কৃৎস্নস্থ্য প্রকাশনে প্রবর্গ্যান্তং ব্রাহ্মণমুপযুক্তম্। নিবৃত্তিলক্ষণস্য বেদার্থস্থ্য প্রকাশনে অত ঊর্দ্ধং বৃহদারণ্যকমুপযুক্তম্। তত্র নিষেকাদিশ্মশানান্তং কম্ম কুব্বন্ জিজীবিষেদ্ যো বিদ্যয়া সহাপরব্রহ্মবিষয়য়া। তদুক্তং “বিদ্যাং চাবিদ্যা চ যস্তদ্বেদোভয়ঃ সহ। অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্ত্বা বিদ্যয়াহ- মৃতমশ্নুতে” ইতি। তত্র কেন মার্গেণ অমৃতত্বম্ অশ্বতে ইত্যুচ্যতে,-“তদ্‌ যৎ তৎ সত্যমসৌ স আদিত্যঃ, য এষ এতস্মিন্ মণ্ডলে পুরুষঃ, যশ্চায়ং দক্ষিণেহক্ষন্ পুরুষঃ, এতদুভয়ং সত্যং ব্রহ্মোপাসীনো যথোক্তকস্মকৃচ্চ যঃ, সোহন্তকালে প্রাপ্তে সত্যা- ত্মানমাত্মনঃ প্রাপ্তিদ্বারং যাচতে হিরণ্ময়েন পাত্রেণ। হিরণ্ময়মিব হিরণ্ময়ং জ্যোতি- স্ময়মিত্যেতৎ। তেন পাত্রেণের অপিধানভূতেন সত্যস্যৈব আদিত্যমণ্ডলস্থস্য ব্রহ্মণঃ অপিহিতম্ আচ্ছাদিতং মুখং দ্বারম্, তৎ ত্বং হে পৃষন্ অপাবৃণু অপসারয়, সত্যধর্মায়- তব সত্যস্য উপাসনাৎ সত্যং ধম্মো যস্য মম সোহহং সত্যধম্মা তস্মৈ মহ্যম্, অথবা যথাভূতস্য ধর্ম্মস্যানুষ্ঠাত্রে, দৃষ্টয়ে তব সত্যাত্মন উপলব্ধয়ে ॥ ১৫ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

মানুষবিত্ত—পশু, ভূমি, হিরণ্যাদি ও দৈববিত্ত—দেবতা-চিন্তাদি, এই উভয়প্রকার বিত্তদ্বারা শাস্ত্রোক্ত যে সকল কর্ম্ম সম্পাদিত হইতে পারে, প্রকৃতিতে লয় হওয়াই সেই সকল কর্ম্মের সর্বোৎকৃষ্ট ফল। কিন্তু সেই সমস্ত ফলই সংসারের অন্তর্গত ও ধ্বংসশীল,(মুক্তির সহিত এ সকলের বড় বেশী সম্বন্ধ নাই)। সর্ব্বপ্রকার কামনা পরিত্যাগ- পূর্ব্বক সন্ন্যাস বা জ্ঞান-নিষ্ঠা অবলম্বনের ফল—সর্ব্বাত্ম-ভাব

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ১৫

প্রাপ্তি। এই উভয়প্রকার ফলই পূর্বপূর্ব্ব মন্ত্রে বর্ণিত হইয়াছে: সুতরাং বলিতে হয় যে,—প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি, এই উভয়বিধ বৈদিক ধর্ম্মই অতীত মন্ত্রসমূহে প্রদর্শিত হইয়াছে। তন্মধ্যে, বৈদিক বিধি-নিষে- ধাত্মক যে সকল বিষয় প্রবৃত্তিপথের উপযোগী, তন্নির্ণয়ার্থ ‘প্রবর্গ কাণ্ড’(একপ্রকার উপাসনাপদ্ধতি) উক্ত হইয়াছে, তাহার পর নিবৃত্তি-পথের উপযোগী প্রমাণ-সমূহও বৃহদারণ্যকোপনিষৎ হইতেই উদ্ধৃত হইয়াছে।

[ এখন বুঝিতে হইবে যে,] যে লোক অপর ব্রহ্ম হিরণ্য- গর্ভাদির উপাসনা-সহকারে শ্মশানান্ত(মৃত্যু পর্য্যন্ত যে সকল কর্ম্ম বিহিত আছে, সেই সকল) কর্ম্ম সম্পাদন করিয়া, জীবনধারণ করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহার জন্য দশম মন্ত্রে অবিদ্যাদ্বারা মৃত্যু অতিক্রমপূর্ব্বক বিদ্যাদ্বারা অমৃত লাভের উপদেশ প্রদত্ত হইয়াছে।

পূর্ব্বোক্ত প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি-পথের মধ্যে কোন পথে প্রকৃত অমৃতত্ব লাভ করা যাইতে পারে, এখন তাহার বিষয় কথিত হইতেছে,—[শ্রুতিতে আছে,] ‘এই আদিত্যই সত্য পুরুষ; সূর্য্যমণ্ডল- স্থিত পুরুষ, ও দক্ষিণ চক্ষুতে সন্নিহিত পুরুষ, এই উভয়ই সত্য স্বরূপ ব্রহ্ম।’ যে লোক এই ব্রহ্ম-পুরুষের উপাসনা করে, এবং শাস্ত্র-বিহিত কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, মৃত্যুকাল উপস্থিত হইলে, সেই লোক “হিরণ্ময়েন পাত্রেণ” ইত্যাদি মন্ত্রে এইরূপে আত্ম-লাভের উপায় প্রার্থনা করিয়া থাকেন,—হে পূষন্!(জগৎপোষক!) হিরণ্ময় অর্থাৎ জ্যোতির্ময়(মণ্ডলরূপ) পাত্রদ্বারা সেই সত্যব্রহ্মের প্রাপ্তি-পথ আবৃত আছে; সত্যরূপী তোমার উপাসনায় এবং প্রকৃতধর্ম্মের সেবায় আমি সত্যধৰ্ম্ম লাভ করিয়াছি; অতএব আমি যাহাতে সত্য ও আত্মস্বরূপ তোমার রূপ দর্শন করিতে পারি, সেইরূপে আমার নিকট হইতে সেই হিরণ্ময় পাত্রের আবরণ উন্মুক্ত করিয়া দাও ॥ ১৫ ॥

৩৬ ঈশোপনিষৎ।

পূষন্নেকর্ষে যম সূর্য্য প্রাজাপত্য ব্যূহ রশ্মীন্ সমূহ তেজো। যৎ তে রূপং কল্যাণতমং তত্তে পশ্যামি, যোহসাবসৌ পুরুষঃ সোহহমস্মি ॥ ১৬ ॥

পূষন্(হে জগৎপোষক সূর্য্য!), একর্ষে(একাকিগমনশীল!) যম(সর্ব্বসংযম- কারিন্) সূর্য্য(ভূম্যাদিরসগ্রাহিন্!) প্রাজাপত্য(প্রজাপতিসম্ভূত!) রশ্মীন্ (মম চক্ষুষ উপতাপকান্) বাহ(বিগময়), তেজঃ(আত্মীয়ং জ্যোতিঃ) সমূহ (সংকোচয়)। তে(তব) যৎ কল্যাণতমং(অত্যন্তশোভনং পুরমমঙ্গলং বা) রূপং তে(তব)[আত্মরূপিণঃ প্রসাদাৎ] তৎ[অহং] পশ্যামি। যঃ অসৌ (জাগ্রদাদ্যবস্থাত্রয়-সাক্ষী আদিত্য মণ্ডলস্থঃ) পুরুষঃ, সঃ অহম্ অস্মি ভবামি। ‘হে জগৎপোষক, একচর, সংযমনকারিন্ প্রজাপতিসম্ভূত সূর্য্য! রশ্মিসমূহ দূর কর; এবং তীব্রতেজঃ সঙ্কোচিত কর; তোমার যাহা অতি মঙ্গলময় রূপ, তাহা দর্শন করি। এই যে, মণ্ডলস্থ পুরুষ, আমিও তৎস্বরূপ হইয়াছি ॥ ১৬॥]

শাঙ্করভাষ্যম্।

পূষন্নিতি। হে পূষন্! জগতঃ পোষণাৎ পূষা রবিঃ, তথৈক এব ঋষতি গচ্ছ- তীত্যেকর্ষিঃ, হে একর্ষে! তথা সর্ব্বস্য সংযমনাদ্ যমঃ, হে যম! তথা রশ্মীনাং প্রাণানাং রসানাঞ্চ স্বীকারণাৎ সূর্য্যঃ, হে সূর্য্য! প্রজাপতেরপত্যং প্রাজাপত্যঃ, হে প্রাজাপত্য! ব্যূহ বিগময় রশ্মীন্ স্বান্। সমূহ একীকুরু উপসংহর তে তেজস্তাপকং জ্যোতিঃ। যৎ তে তব রূপং কল্যাণতমমত্যন্তশোভনম্, তৎ তে তবাত্মনঃ প্রসাদাৎ পশ্যামি। কিঞ্চ, অহং ন তু ত্বাং ভৃত্যবদ্‌ যাচে, যোহসাবাদিত্য- মণ্ডলস্থো ব্যাহৃত্যবয়বঃ পুরুষঃ পুরুষাকারত্বাৎ, পূর্ণং বা অনেন প্রাণবুদ্ধ্যাত্মনা জগৎ সমস্তমিতি পুরুষঃ, পুরি শয়নাদ্বা পুরুষঃ, সোহহমস্মি ভবামি ॥ ১৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

হে জগৎপোষণকারিন্ পৃষন্, হে একাকী বিচরণশীল—একর্ষে, হে সর্ব্বসংহারকারিন্—যম, হে তেজঃ ও রশ্মিগ্রাহিন্—সূর্য্য,

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৩।

হে প্রজাপতিনন্দন—প্রাজাপত্য! তুমি তোমার রশ্মিসমূহ অপসারিত কর, এবং সন্তাপকর তেজকে সংকোচিত কর; তোমার যাহা অতিশয় কল্যাণময়—সুন্দর রূপ, তাহা তোমার অনুগ্রহে দর্শন করিব। অপিচ, আমি তোমার নিকট ভৃত্যের ন্যায় প্রার্থনা করিতেছি না; পরন্তু এই যে, আদিত্য মণ্ডলস্থ পুরুষ, ব্যাহৃতি(ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ) তাঁহার অবয়ব এবং পুরুষের মত তাঁহার আকৃতি বলিয়াই হউক, অথবা, প্রাণ ও বুদ্ধি প্রভৃতিরূপে তাহা দ্বারা সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত বলিয়াই হউক, কিংবা হৃৎপদ্মরূপ পুরে বাস করেন বলিয়াই হউক, তিনি ‘পুরুষ’-পদবাচ্য; আমি তাঁহারই স্বরূপ ॥ ১৬ ॥

বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম্। ওঁম্ ক্রতো স্মর, কৃতং স্মর, ক্রতো স্মর কৃতং স্মর ॥ ১৭ ॥

অথ(ইদানীং)[মরিষ্যতঃ মম] বায়ুঃ(প্রাণঃ) অনিলম্(অধিদৈবভং সর্ব্বাত্মকং) অমৃতং(সূত্রাত্মানম্)(প্রতিপদ্যতাম্ ইতি শেষঃ)। ইদং শরীরম্ [ অগ্নৌ হুতং সৎ] ভস্মান্তং[ভূয়াৎ]। ওঁম্(ব্রহ্মপ্রতীকত্বাৎ সশক্তিকং ব্রহ্ম) ক্রতো!(হে সংকল্পাত্মক মনঃ)[অধুনা কর্তব্যং কৰ্ম্ম] স্মর(চিন্তয়), কৃতং (যাবজ্জীবমনুষ্ঠিতং কৰ্ম্ম চ) স্মর।

অনন্তর আমার প্রাণবায়ু মহাবায়ুতে এবং এই শরীর ভস্মেতে মিলিত হউক। হে চিন্তাশীল মন! তুমি তোমার কৃত ও কর্তব্য বিষয় স্মরণ কর ॥ ১৭ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

বায়ুরিতি। অথেদানীং মম মরিষ্যতো বায়ুঃ প্রাণোহধ্যাত্মপরিচ্ছেদং হিত্বা অধিদৈবতাত্মানং সর্ব্বাত্মকমনিলমমৃতং সূত্রাত্মানং প্রতিপদ্যতামিতি বাক্য- শেষঃ। লিঙ্গঞ্চেদং জ্ঞানকৰ্ম্মসংস্কৃতমুৎক্রামত্বিতি দ্রষ্টব্যম্, মার্গ-যাচনসামর্থ্যাৎ। অথেদং শরীরমগ্নৌ হুতং ভস্মান্তং ভূয়াৎ। ওঁমিতি যথোপাসনম্ ওঁম্ প্রতীকাত্ম- কত্বাৎ সত্যাত্মকমগ্নাখ্যং ব্রহ্মাভেদেনোচ্যতে। হে ক্রতো সঙ্কল্পাত্মক স্মর যৎ মম

৩৮’ ঈশোপনিষৎ।

স্মর্তব্যং, তস্য কালোহয়ং প্রত্যুপস্থিতঃ, অতঃ স্মর। এতাবন্তং কালং ভাবিতং কৃত- মগ্নে(১) স্মর—যৎ ময়া বাল্যপ্রভৃত্যনুষ্ঠিতং কৰ্ম্ম, তচ্চ স্মর। ক্রতো স্মর, কৃতং স্মরেতি পুনর্বচনমাদরার্থম্ ॥ ১৭ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

এখন আমার মৃত্যুকাল উপস্থিত; এখন আমার প্রাণবায়ু অধ্যাত্ম- সীমা, অর্থাৎ দৈহিক সম্বন্ধ ত্যাগ করিয়া বায়ুর অধিদেবতা সূত্রাত্মাকে (সূক্ষ্ম রূপ) প্রাপ্ত হউক, এবং সদসৎ চিন্তা ও শুভাশুভ কর্মের সংস্কার যুক্ত এই লিঙ্গ শরীর * স্থূলদেহ হইতে বহির্গত হউক, অনন্তর এই শরীর অগ্নিতে আহুত হইয়া ভস্মে পরিণত হউক। হে ক্রতো— শুভাশুভচিন্তাকারিন্ মন! এখন স্মরণ কর, যাহা তোমার স্মরণ করা উচিত; তাহার উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইয়াছে। শৈশব হইতে এ কাল পর্য্যন্ত যে সমস্ত কৰ্ম্ম করিয়াছ, তাহাও স্মরণ কর। আগ্রহাতিশয়ে একই কথার পুনরুক্তি করা হইয়াছে। উপাসনা কালে প্রথমেই প্রণবের ব্যবহার হয়; তদনুসারে এখানেও সত্যরূপী অগ্নি ও ব্রহ্মের অভিন্নতা জ্ঞাপনার্থ সর্ব্বাত্মবোধক প্রণবের প্রথমে প্রয়োগ করা হইয়াছে ॥ ১৭ ॥

অগ্নে নয় সুপথা রায়ে অস্মান্ * বিশ্বানি দেব বয়ুনানি বিদ্বান্। যুযোধ্যস্মজ্জুহুরাণমেনো ভূয়িষ্ঠাং তে নম-উক্তিং বিধেম ॥ ১৮ ॥

* অশ্বে ইঁত কচিৎ পাঠঃ।

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৩৯

ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে॥

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ হরিঃ ওঁ ॥ ঈশোপনিষৎ সমাপ্তা ॥

হে অগ্নে, অস্মান্ রায়ে(ধনায়, কৰ্ম্মফলভোগায়) সুপথা(শোভনেন দেবযানাখ্য- মার্গেণ) নয়(গময়)। হে দেব,[ ত্বং] বিশ্বানি(সর্ব্বাণি) বয়ুনানি(কর্ম্মাণি, জ্ঞানানি বা) বিদ্বান্(জানন্) অস্মৎ(অস্মত্তঃ) জুহুরাণং(কুটিলম্) এনঃ (পাপং) যুযোধি(বিযোজয়, নাশয়েতিযাবৎ)। তে(তুভ্যং) ভূয়িষ্ঠাং(বহুতরাং) নম-উক্তিং(নমস্কারবচনং) বিধেম(নমস্কারেণ ত্বাং প্রসাদয়েম ইতি ভাবঃ)।

হে অগ্নি! তুমি আমাদিগকে সুপথে লইয়া যাও। হে দেব! তুমি আমাদের সমস্ত কর্মই জান; আমাদের অপকারী পাপসমূহ বিদূরিত কর। আমরা প্রচুর পরিমাণে তোমাকে নমস্কার করিতেছি ॥ ১৮॥

* শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

পুনরন্যেন মন্ত্রেণ মার্গং যাচতে,-অগ্নে নয়তি। হে অগ্নে, নয় গময়, সুপথা শোভনেন মার্গেণ। সুপথেতি বিশেষণং দক্ষিণমার্গ-নিবৃত্ত্যর্থম্। নির্বিঘ্নোহহং দক্ষিণেন মার্গেণ গতাগতলক্ষণেন, অতো যাচে ত্বাং পুনঃপুনর্গমনাগমনবর্জিতেন শোভনেন পথা নয়। রায়ে ধনায়-কৰ্ম্মফলভোগায়েত্যর্থঃ। অস্মান্ যথোক্তধৰ্ম্ম- ফলবিশিষ্টান, বিশ্বানি সর্ব্বাণি, হে দেব, বয়ুনানি কর্মাণি প্রজ্ঞানানি বা বিদ্বান্ জানন্। কিঞ্চ, যুযোধি বিযোজয় বিনাশয়-অস্মৎ অস্মত্তো জুহুরাণং কুটিলং বঞ্চ- নাত্মকমেনঃ পাপম্। ততো বয়ং বিশুদ্ধাঃ সন্ত ইষ্টং প্রাপ্স্যাম ইত্যভিপ্রায়ঃ। কিন্তু বয়মিদানীং তে ন শরুমঃ পরিচর্য্যাং কর্ত্তুম্; ভূয়িষ্ঠাং বহুতরাম্ তে তুভ্যং নম-উক্তিং নমস্কারবচনং বিধেম নমস্কারেণ পরিচরেম ইত্যর্থঃ।

“অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীর্ত্বা বিদ্যয়াহমৃতমশ্নুতে।” “বিনাশেন মৃত্যুং তীর্ত্বা সম্ভৃত্যাহমৃতশ্নুতে” ইতি শ্রুত্বা কেচিৎ সংশয়ং কুর্ব্বন্তি, অতস্তন্নিরাকরণার্থং সক্ষেপতো বিচারণাং করিষ্যামঃ। তত্র তাবৎ কিন্নিমিত্তঃ সংশয় ইত্যুচ্যতে;- বিদ্যা-শব্দেন মুখ্যা পরমাত্মবিদ্যৈব কস্মাৎ ন গৃহ্যতেইমৃতত্বঞ্চ? ননুক্তায়াঃ পরমাত্ম-

৪০ ঈশোপনিষৎ।

বিদ্যায়াঃ কর্মণশ্চ বিরোধাৎ সমুচ্চয়ানুপপত্তিঃ। সত্যম্, বিরোধস্ত নাবগম্যতে, বিরোধাবিরোধয়োঃ শাস্ত্র প্রমাণকত্বাৎ; যথা অবিদ্যানুষ্ঠানং বিদ্যোপাসনঞ্চ শাস্ত্র- প্রমাণকম্, তথা তদ্বিরোধাবিরোধাবপি। যথা চ “ন হিংস্যাৎ সর্ব্বা ভূতানি ইতি” শাস্ত্রাদবগতং পুনঃ শাস্ত্রেণৈব বাধ্যতে, “অধ্বরে পশুং হিংস্যাদ” ইতি, এবং বিদ্যা- বিদ্যয়োরপি স্যাৎ। বিদ্যাকৰ্ম্মণোশ সমুচ্চয়ো ন “দূরমেতে বিপরীতে বিষুচী, অবিদ্যা, যা চ বিদ্যা” ইতি শ্রুতেঃ। “বিদ্যা চাবিদ্যাং চ” ইতিবচনাদবিরোধইতি চেৎ, ন; হেতু-স্বরূপ-ফলবিরোধাৎ। বিদ্যাবিদ্যা-বিরোধাবিরোধয়োবিকল্পাসম্ভবাৎ সমুচ্চয়-বিধানাদবিরোধ এবেতি চেৎ, ন; সহসম্ভবানুপপত্তেঃ। ক্রমেণৈকাশ্রয়ে স্যাতাং বিদ্যাবিদ্যে ইতি চেৎ, ন; বিদ্যোৎপত্তৌ অবিদ্যায়া হ্যস্তত্বাৎ তদাশ্রয়েহ- বিদ্যানুপপত্তেঃ। ন হ্যাগ্নিরুষ্ণঃ প্রকাশশ্চেতিবিজ্ঞানোৎপত্তৌ যস্মিন্নশ্রিয়ে তদুৎপন্নং, তস্মিন্নেবাশ্রয়ে শীতোহগ্নিরপ্রকাশো বেত্যবিদ্যায়া উৎপত্তিঃ, নাপি সংশয়োহজ্ঞানং বা। “মস্মিন্ সর্ব্বাণি ভূতান্যাত্মৈবাভূদ্বিজানতঃ। তত্র কো মোহঃ কঃ শোক একত্বমনু- পশ্যতঃ।” ইতি শোকমোহাসম্ভবশ্রুতেঃ। অবিধ্যাসম্ভবাত্তদুপাদানস্য কৰ্ম্মণো- হনুপপত্তিমবোচামঃ, অমৃতমশ্নুত ইত্যাপেক্ষিকমমৃতম্। বিদ্যাশব্দেন পরমাত্ম-বিদ্যা গ্রহণে হিরণয়েন ইত্যাদিনা দ্বার-মার্গাদিযাচনমনুপপন্নং স্যাৎ। তস্মাদুপাসনয়া সমুচ্চয়ঃ ন, পরমাত্মবিজ্ঞানেনেতি যথাহস্মাভিব্যাখ্যাত এব মন্ত্রাণামর্থ ইত্যুপরম্যতে ॥ ১৮ ॥

ইতি শ্রীগোবিন্দভগবৎ-পূজ্যপাদশিষ্যস্য পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীশঙ্করভগবতঃ কৃতৌ বাজসনেয়সংহিতোপনিষদ্ভাষ্যং সম্পূর্ণম্ ॥

সেয়মল্পপদোপেতা শ্রীশঙ্করমতে স্থিতা। শ্রীদুর্গাচরণায়াতা সরলা স্যাৎ সতাং মুদে॥

ভাষ্যানুবাদ।

পুনশ্চ অপর মন্ত্রে অভীষ্ট পথ প্রার্থনা করিতেছেন,—হে অগ্নি! আমাকে সুপথে লইয়া যাও। ‘সুপথ’ বলিবার অভিপ্রায় এই যে, আমি কর্ম্মিগণের দক্ষিণ-পথে বহুবার গমন করিয়া জন্ম- মরণ যাতনা ভোগ করিয়াছি। এখন তাহাতে নির্ব্বেদ(বৈরাগ্য) হইয়াছে, আর যেন সেই দক্ষিণ-পথে যাইয়া যাতনা; ভোগ করিতে

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৪১

না হয়, তাহা তুমি কর, অতি সুন্দর দেবযান পথে লইয়া যাও এবং আমাদের উপযুক্ত ফল প্রদান কর।

হে দেব! তুমি আমাদের আচরিত কৰ্ম্ম ও জ্ঞান, সমস্তই জান; অতএব কুটিলস্বভাব(আপাততঃ মনোরম কিন্তু পরিণামে ক্লেশ- প্রদ) পাপসকল বিদূরিত কর; তাহা হইলেই আমরা নিষ্পাপ— বিশুদ্ধ হইয়া শুভ ফল পাইতে পারিব। হে দেব! এখন মৃত্যুকাল উপস্থিত; এ সময় আর অন্য প্রকারে তোমার পরিচর্যা করিতে পারিতেছি না, অতএব কেবলই নমস্কার করিতেছি; অর্থাৎ কেবল নমস্কার দ্বারাই তোমার আরাধনা করিতেছি; তুমি প্রসন্ন হইয়া আমাকে অভীষ্ট ফল প্রদান কর।

ভাষ্যকার বলিতেছেন,- ‘অবিদ্যা’ ও ‘বিনাশ সেবার’ ফল মৃত্যু অতিক্রম করা, আর বিদ্যা ও অসম্ভুতি-সেবার ফল অমৃতত্ব লাভ; এই দ্বিবিধ ফল শ্রুতি দর্শন করিয়া কেহ কেহ শঙ্কা করিয়া থাকেন যে, আমরা যে প্রকার বিদ্যা ও অবিদ্যার এবং অসম্ভুতি ও বিনাশের সেবায় বিরোধ ও অবিরোধের ব্যবস্থা করিয়াছি, তাহা বোধ হয় সত্য নহে। সেই শঙ্কা নিবারণার্থ তদ্বিষয়ে কিঞ্চিৎ বিচার করা আবশ্যক হইতেছে। তাহাদের আপত্তি এই যে, এখানে ‘বিদ্যা’ শব্দে প্রকৃত বিদ্যা-পরমাত্ম-জ্ঞান ও অমৃতশব্দে মুখ্য অমৃতত্ব-মুক্তি অর্থ গ্রহণ না করিয়া অন্য অর্থ গ্রহণ করিবার কারণ কি? অবশ্য একথার উপরেও আপত্তি হইতে পারে যে, পরমাত্ম-জ্ঞানের সহিত কর্মানুষ্ঠানের বিরোধ যখন অপরিহার্য্য, তখন তদুভয়ের সমুচ্চয় বা সহানুষ্ঠান ত কিছুতেই হইতে পারে না? হ্যাঁ, একথা সত্য বটে; কিন্তু এখানে ত সেই বিরোধের সম্ভাবনা নাই; কারণ, কাহার সহিত কাহার বিরোধ হইতে পারে, না পারে, তদ্বিষয়ে শাস্ত্রই একমাত্র প্রমাণ। যে শাস্ত্র বিদ্যা ও অবিদ্যার উপাসনার বিধান করিতেছেন, সেই শাস্ত্রই যখন তদুভয়ের

৪২ ঈশোপনিষৎ।

সমুচ্চয়ে অনুমতি দিতেছেন, তখন তদ্বিষয়ে আর বিরোধ কি আছে? যেমন, ‘কোন প্রাণীর হিংসা করিবে না’; এই শাস্ত্র যে প্রাণিহিংসার অকর্তব্যতা বা অবৈধতা জ্ঞাপন করিতেছে; ‘যজ্ঞে পশুহিংসা করিবে’, এই শাস্ত্র আবার সেই প্রাণিহিংসারই অনুমতি দিয়া কর্তব্যতা বিধান করিতেছেন। তদুভয়ের বিরোধ নাই। বিদ্যা ও অবিদ্যা সম্বন্ধেও সেই কথা। ‘বিদ্যা ও অবিদ্যা বিপরীত ফল- প্রদ ও অত্যন্ত বিরুদ্ধ; এই শাস্ত্র দ্বারা যেমন বিদ্যাং ও অবিদ্যার সমুচ্চয় নিষিদ্ধ হইয়াছে; তেমনি আবার “বিদ্যাং বা বিদ্যাং চ যস্ত- দ্বেদোভয়ং সহ”, এই শাস্ত্র দ্বারা তদুভয়ের অবিরোধ বা সহানুষ্ঠানও সমর্থিত হইয়াছে। না,-এরূপ সিদ্ধান্ত হইতে পারে না; তাহা ‘হইলে বিদ্যা’ও অবিদ্যার হেতু, স্বরূপ ও ফলের বিরোধ উপস্থিত হয়, অবিদ্যার হেতু-অজ্ঞান(দেহাদিতে আত্মবুদ্ধি প্রভৃতি। আর বিদ্যার হেতু ঠিক তাহার বিপরীত। এবং উভয়ের স্বরূপ ও ফল এক প্রকার নহে-সম্পূর্ণ পৃথক্। সুতরাং বিদ্যা ও অবিদ্যার অবিরোধ বা সমুচ্চয় হইতেই পারে না।

যদি বল, হয় বিদ্যার অনুশীলন, না হয় অবিদ্যার অনুষ্ঠান করিবে; এইরূপে যখন বিকল্প-ব্যবস্থা হইতে পারে না, অথচ শাস্ত্র যখন উভয়ের সহানুষ্ঠানের বিধান দিতেছেন, তখন কখনই তদুভয়ের মধ্যে বিরোধ থাকিতে পারে না। না—একথাও সঙ্গত হইল না; কারণ, পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে, বিপরীতভাবাপন্ন জ্ঞান ও কর্ম্মের সহাবস্থান বা একসঙ্গে অনুষ্ঠান নিতান্তই অসম্ভব। যদি বল, এক সঙ্গে না হউক, পৌর্ব্বাপর্য্যক্রমেও একই ব্যক্তিতে আত্ম-বিদ্যা ও অবিদ্যা থাকিতে পারে? না—তাহাও পারে না; আত্মজ্ঞান উৎপন্ন হইলেই দেহাদিতে আত্ম-বুদ্ধিরূপ অবিদ্যা অন্তর্হিত হইয়া যায়; সুতরাং সে অবস্থায় আর অবিদ্যা থাকিবার সম্ভব কি? দেখ, যে

শাঙ্কর-ভাষ্য-সমেতা। ৪৩

লোক বুঝিয়াছে যে, অগ্নি স্বভাবতই উষ্ণ ও প্রকাশময়; আর কখনও কি তাহার ‘অগ্নি শীতল ও প্রকাশহীন’ এইরূপ ভ্রম, সংশয়; কিংবা বিপরীত জ্ঞান হইতে পারে? “যস্মিন্ সর্ব্বাণি ভূতানি” ইত্যাদি শ্রুতি ত স্পষ্টাক্ষরেই বলিতেছেন যে, আত্মৈকত্বদর্শীর আর কখনও শোক-মোহ সমুৎপন্ন হয় না। ইতঃপূর্ব্বে আমরাও বলিয়াছি যে জ্ঞানীর পক্ষে অবিদ্যা বিধ্বস্ত হওয়ায়, তম্মূলক কর্মানুষ্ঠানেরও সম্ভব নাই।

এই শাস্ত্রে যে, ‘বিদ্যা’ শব্দ আছে, তাহার অর্থ আত্ম-জ্ঞান নহে, দৈবত-চিন্তাবিশেষ। ‘পরমাত্ম-জ্ঞান’ অর্থ হইলে আর আত্মলাভ বা অভীষ্টফলপ্রাপ্তির জন্য ‘হিরণ্ময়েন’ মন্ত্র দ্বারা আত্ম-লাভের দ্বার— সুপথ প্রার্থনা করিবার আবশ্যক হইত না। কারণ, আত্মজ্ঞ পুরুষের দেহত্যাগের পর আর কোথাও যাইতে হয় না, দেহত্যাগে ব্রহ্ম- নির্ব্বাণ লাভ হয়। এই কারণ ‘অমৃত’ শব্দের অর্থও মুখ্য অমৃতত্ব (মুক্তি) নহে—দীর্ঘকালস্থায়িত্ব মাত্র। * অতএব, আমরা যে বলিয়াছি, উপাসনারূপ বিদ্যার সঙ্গেই কর্ম্মের সমুচ্চয়—পরমাত্ম- জ্ঞানের সহিত নহে; সেই কথাই যুক্তিযুক্ত ॥ ১৮ ॥

ঈশাবাস্যোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥